back to top

চট্টগ্রামে শিশুদের ওপর পাশবিকতা: পাঁচ থানায় ছয় ঘটনা, ক্ষোভ-বিক্ষোভ

প্রকাশিত: ২৪ মে, ২০২৬ ০৫:৩২

চট্টগ্রাম নগরে যেন থামছেই না শিশুদের ওপর পাশবিক নির্যাতনের খবর। একটির পর একটি ঘটনা সামনে আসছে, আর প্রতিবারই আরও ভারী হয়ে উঠছে আতঙ্ক, ক্ষোভ ও শঙ্কার পরিবেশ।

মাত্র ৪৮ ঘণ্টারও কম সময়ে নগরের পাঁচটি এলাকায় ছয় শিশুকে ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ উঠেছে।

কোথাও চার বছরের শিশু, কোথাও পাঁচ বা সাত বছরের শিশু, আবার কোথাও দুই বোনকে একসঙ্গে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ।

এসব ঘটনায় শুধু অভিভাবকদের নয়, পুরো নগরবাসীর মধ্যেই তৈরি হয়েছে গভীর নিরাপত্তাহীনতা। প্রশ্ন উঠছে—শিশুরা তাহলে কোথায় নিরাপদ?

ঘটনাগুলোর ভয়াবহতা আরও বাড়িয়েছে অভিযুক্তদের পরিচয় ও ঘটনার ধরন। কেউ মুদি দোকানি, কেউ শিক্ষক, কেউ স্থানীয় পরিচিত ব্যক্তি—অর্থাৎ যাদের ঘিরে পরিবার ও শিশুরা স্বাভাবিক আস্থা তৈরি করে, অভিযোগ উঠছে তাদের বিরুদ্ধেই।

ফলে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে পরিবারগুলোতে।

শিশু অধিকারকর্মীরা বলছেন, এটি শুধু কয়েকটি অপরাধের ঘটনা নয়; বরং সমাজের গভীরে ছড়িয়ে পড়া নৈতিক অবক্ষয়, বিচারহীনতা ও সামাজিক দায়হীনতার নির্মম প্রতিফলন।

এসব ঘটনার পর নগরের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। কোথাও অভিযুক্তকে গণপিটুনি দেওয়া হয়েছে, কোথাও পুলিশের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছে।

বাকলিয়ায় পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে স্থানীয়দের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে টিয়ার গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ও রাবার বুলেট ছুড়তে হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এমন অবনতি নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে নগরবাসীর মধ্যে।

নগরের বাকলিয়া, চান্দগাঁও, খুলশি, ডবলমুরিং ও বায়েজিদ বোস্তামী থানা এলাকায় এসব ঘটনা ঘটে। এ পর্যন্ত পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিটি ঘটনাই গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ঘটে চান্দগাঁও থানার সিঅ্যান্ডবি টেকবাজার এলাকায়। চার বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে ৫৫ বছর বয়সী মুদি দোকানি আশফাকুর রহমানের বিরুদ্ধে।

পুলিশ জানায়, শিশুটির পরিবার নিয়মিত ওই দোকান থেকে কেনাকাটা করত। গত ১৫ মে শিশুটিকে একা পেয়ে দোকানের ভেতরে নিয়ে যৌন নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ।

শিশুটি বিষয়টি পরিবারের সদস্যদের জানালেও সামাজিক সংকোচ ও ভবিষ্যতের কথা ভেবে পরিবার প্রথমে ঘটনাটি গোপন রাখে।

পরে শুক্রবার বিষয়টি এলাকায় জানাজানি হলে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। রাতে মামলা হওয়ার পর অভিযান চালিয়ে অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

চান্দগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ নুর হোসেন মামুন বলেন, পরিবারের দায়ের করা মামলায় অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

একই রাতে খুলশি থানার আমবাগান এলাকায় ১০ ও ৬ বছর বয়সী দুই বোনকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে আবদুল বাতেন নামে এক মাদ্রাসাশিক্ষককে গ্রেপ্তার করা হয়।

ঘটনাটি ঘটে খুলশীর আবহাওয়া অফিসসংলগ্ন একটি মাদ্রাসায়। অভিযুক্তের বাড়ি কুমিল্লায়। এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে এবং তারা বিক্ষোভ করেন।

খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান বলেন, শিক্ষকতার সুবাদে অভিযুক্ত ব্যক্তি ওই এলাকায় থাকতেন। ভুক্তভোগী দুই শিশুরও শিক্ষক ছিলেন তিনি। অভিযোগটি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।

শুক্রবার দুপুরে ডবলমুরিং থানার হাজীপাড়া এলাকায় সাত বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে এহসান নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। স্থানীয় লোকজন তাঁকে আটক করে মারধর করেন।

পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে অভিযুক্তকে উদ্ধার করে থানায় নেওয়ার চেষ্টা করলে বিক্ষুব্ধ জনতা বাধা দেয়। একপর্যায়ে অভিযুক্তকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টাও করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

একই দিন নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার মোহাম্মদনগর এলাকায় পাঁচ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে মোহাম্মদ হাসান নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়।

পুলিশ জানায়, ১০ টাকা দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে শিশুটিকে ঘরে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। পরে পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা করে পুলিশ অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে।

এর আগে বৃহস্পতিবার বাকলিয়া এলাকায় চার বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগকে কেন্দ্র করে ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ও রাবার বুলেট ছোড়ে। এ ঘটনায় ডেকোরেশন দোকানের কর্মচারী মনির হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তিনি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

একাধিক ঘটনায় অভিযুক্তরা ভুক্তভোগী পরিবারের পরিচিত ব্যক্তি হওয়ায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, শিশুদের নিরাপত্তা এখন শুধু বাইরের নয়, পরিচিত পরিবেশের মধ্যেও বড় হুমকির মুখে পড়েছে।