এক মুহূর্তের তীব্র কম্পনেই যেন বদলে গেল পশ্চিম কলম্বিয়ার চিত্র। ৭ দশমিক ৪ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে দেশজুড়ে অন্তত ১৩২ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ৫৭০ জন।
এখনো নিখোঁজ রয়েছেন কয়েকশ মানুষ। ফলে উদ্ধার অভিযান যত এগোচ্ছে, ততই বাড়ছে হতাহতের আশঙ্কা।
গত সোমবার স্থানীয় সময় শক্তিশালী এই ভূমিকম্প আঘাত হানে। কলম্বিয়ার ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার মতে, চলতি শতাব্দীতে দেশটির ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প।
তীব্র কম্পনে পশ্চিম কলম্বিয়ার কালি, পেরেইরা, কিবদো ও মানিজালেসসহ বিভিন্ন শহর কেঁপে ওঠে।
এর প্রভাব শুধু কলম্বিয়াতেই সীমাবদ্ধ ছিল না; পার্শ্ববর্তী দেশ ইকুয়েডর ও পানামাতেও ভূমিকম্পের কম্পন অনুভূত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল রাজধানী বোগোতা থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার পশ্চিমে চোকো অঞ্চলের সান হোসে দেল পালমারের কাছে। ভূগর্ভের প্রায় ১০৭ কিলোমিটার গভীরে ছিল এর কেন্দ্রস্থল।
মূল কম্পনের পরও থামেনি আতঙ্ক। পরবর্তী কয়েক ঘণ্টায় দেশটিতে অন্তত ২১টি পরাঘাত বা আফটারশক অনুভূত হয়েছে।
তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে কলম্বিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম শহর কালি থেকে।
স্থানীয় প্রশাসনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কালিতে অন্তত ২০টি ভবন ধসে পড়েছে। আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ৩৮০টি ভবন। ধসে পড়া ভবনগুলোর ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও অনেক মানুষ আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সময় যত গড়াচ্ছে, ততই কঠিন হয়ে উঠছে উদ্ধারকাজ। তবু হাল ছাড়ছেন না উদ্ধারকর্মীরা। তাঁদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন সাধারণ মানুষও। ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবিত কাউকে পাওয়া যায় কি না, সেই আশায় চলছে প্রাণপণ চেষ্টা।
ভূমিকম্পের ভয়াবহতা বোঝাতে গিয়ে প্রত্যক্ষদর্শী ট্যাক্সিচালক হোর্হে মোনকায়ো বলেন, কম্পনের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে চারদিকে শুধু ধুলার মেঘ দেখা যাচ্ছিল। তাঁর জীবনে এমন শক্তিশালী ভূমিকম্পের অভিজ্ঞতা আগে কখনো হয়নি।
আরেক বাসিন্দা হুয়ান কার্লোস ওসোরিও জানান, ভবন ধসে পড়ার শব্দ ছিল অনেকটা শক্তিশালী বোমা বিস্ফোরণের মতো।
নবনিযুক্ত প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই পড়েছেন ভয়াবহ এই জাতীয় সংকটে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় সরকার ইতিমধ্যে দেশজুড়ে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে।
এক বিবৃতিতে প্রেসিডেন্ট এসপ্রিয়েলা জানিয়েছেন, এই মুহূর্তে সরকারের প্রধান লক্ষ্য মানুষের জীবন রক্ষা করা এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের দ্রুত উদ্ধার করা।
সরকারি ব্যবস্থার পাশাপাশি নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজতে স্থানীয়রাও নিজেদের উদ্যোগে তথ্য সংগ্রহ করছেন। নিখোঁজ ব্যক্তিদের তথ্য স্থানীয় একটি ডিজিটাল ডেটাবেজে জমা দেওয়া হচ্ছে। সোমবার বিকেল পর্যন্ত সেখানে প্রায় এক হাজার চারশ মানুষের তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে।
ভূমিকম্পে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণে পেরেইরা, মানিজালেস, কিবদোসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এতে উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতায় নতুন করে চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’ অঞ্চলে অবস্থানের কারণে কলম্বিয়া একটি ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ। তবে ১৯৯৯ সালের পর দেশটিতে আর কোনো বড় মাত্রার ভূমিকম্প দেখা দেয়নি। সেই তুলনায় সোমবারের ৭ দশমিক ৪ মাত্রার এই ভূমিকম্প দেশটির জন্য এক নজিরবিহীন দুর্যোগ হয়ে দেখা দিয়েছে।
ভয়াবহ এই দুর্যোগে কলম্বিয়ার পাশে দাঁড়িয়েছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ১ কোটি ৫৫ লাখ ডলার অর্থ সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে।
এ ছাড়া মেক্সিকো, চিলি, এল সালভাদর, ইসরায়েল ও ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশও কলম্বিয়াকে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
তবে বিপর্যয়ের প্রকৃত চিত্র এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও মানুষ আটকা পড়ে থাকার আশঙ্কা রয়েছে। উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
