রায়হান সিকদার, লোহাগাড়া প্রতিনিধিঃ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের অপরাধ ও সামাজিক নানা বিষয়ে সচেতন করতে সরাসরি শ্রেণিকক্ষে গিয়ে সচেতনতামূলক পাঠ দিলেন চট্টগ্রামের লোহাগাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ। তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, “শিক্ষা হল আমাদের সাম্প্রতিক সমাজের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা একান্ত জরুরি, যাতে তারা ভবিষ্যতে একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।”
প্রায় দেড় ঘণ্টার এ ক্লাসে তিনি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করেন ইভটিজিং, মাদক, কিশোর গ্যাং, বাল্যবিবাহ, সাইবার অপরাধসহ বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা নিয়ে। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, “সামাজিক সমস্যাগুলোর প্রভাব কতটা গভীর হতে পারে।” পরে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয় মাদক ও কিশোর অপরাধবিরোধী সচেতনতামূলক র্যালি। এ সময় বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় কৃতিত্ব অর্জনকারী শিক্ষার্থীদেরও পুরস্কৃত করা হয়, যা তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতার মনোভাব তৈরি করে।
সোমবার (৩১ আগস্ট) সকালে লোহাগাড়া উপজেলার উত্তর আমিরাবাদ এম. বি উচ্চ বিদ্যালয়ে এ সচেতনতামূলক কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়। বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটি এবং শিক্ষকদের সহযোগিতায় এই কার্যক্রমটি পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
নির্ধারিত ক্লাস চলাকালে হঠাৎ শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত হন ওসি মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ। পুলিশের একজন কর্মকর্তাকে সরাসরি শ্রেণিকক্ষে পেয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে কৌতূহল তৈরি হলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই তা রূপ নেয় প্রাণবন্ত আলোচনায়। শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পাশাপাশি অপরাধ থেকে নিজেদের দূরে রাখার কৌশল ও বিপদে পড়লে করণীয় সম্পর্কে ধারণা দেন তিনি। তিনি বলেন, “শিক্ষার্থীরা যেন নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে পারে, সে দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।”
আলোচনায় ওসি বলেন, ইভটিজিং, মাদক, কিশোর গ্যাং কিংবা যেকোনো অপরাধের শিকার হলে ভয় পেয়ে চুপ থাকা যাবে না। বিষয়টি পরিবার, শিক্ষক অথবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানাতে হবে। তিনি আরও বলেন, “প্রতি শিক্ষার্থীর উচিত একটি সুরক্ষার নেটওয়ার্ক তৈরি করা, যেন তারা বিপদে পড়লে সাহায্য পেতে পারে।” অপরাধ প্রতিরোধে শিক্ষার্থী ও তরুণদের সচেতন ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশ শুধু আইন প্রয়োগই করেনা, সমাজ গঠনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখাও আমাদের দায়িত্ব।”
পুলিশের ভূমিকা সমাজে
ক্লাসে মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার, অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে অনলাইনে যোগাযোগ, মাদকাসক্তির ভয়াবহতা, কিশোর গ্যাংয়ে জড়িয়ে পড়ার পরিণতি, ইভটিজিং, নারী ও শিশু নির্যাতন, বাল্যবিবাহ এবং নৈতিক মূল্যবোধসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করা হয়। ওসি মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, “এগুলো আমাদের সমাজের জন্য মারাত্মক সমস্যা।”
শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে ওসি মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বলেন, কিশোর বয়সে অনেকেই বন্ধুদের প্ররোচনা, কৌতূহল কিংবা অসচেতনতার কারণে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। শুরুতেই সচেতন হলে এসব ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব। তিনি বলেন, “ভালো বন্ধু নির্বাচন করা এবং পরিবারকে সবসময় সঙ্গে রাখা প্রয়োজন।” তাই ভালো বন্ধু নির্বাচন, পরিবারের সঙ্গে খোলামেলা যোগাযোগ এবং পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
এ সময় কোনো শিক্ষার্থী বিপদে পড়লে কিংবা আশপাশে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঘটতে দেখলে তা গোপন না রেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানোর আহ্বান জানানো হয়। শিক্ষার্থীদের আইনি সহায়তা নেওয়ার বিভিন্ন পদ্ধতি সম্পর্কেও অবহিত করা হয়, যাতে তারা জানেন কিভাবে নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে হবে।
পরে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে ইভটিজিং, কিশোর গ্যাং ও মাদকবিরোধী একটি সচেতনতামূলক র্যালি বের করা হয়। র্যালিতে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ ও আশপাশের সড়ক প্রদক্ষিণ করে। এই র্যালির মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করছে এবং নিজেদের নিরাপত্তার জন্য সচেতন হচ্ছে।
অনুষ্ঠানের আরেকটি পর্বে বিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় কৃতিত্ব অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। পুরস্কার পেয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যায়, যা তাদের ভবিষ্যতের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে।
