back to top

বন্দরে ঘুষের অভিযোগে প্রশাসনের কড়া অবস্থান, ঠিকাদারদের ব্ল্যাকলিস্টের হুঁশিয়ারি

প্রকাশিত: ১৭ জুন, ২০২৬ ০৯:১৫

চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন দাপ্তরিক কার্যক্রমে ঘুষ ও অনৈতিক লেনদেনের অভিযোগ নতুন নয়।

ফাইল প্রক্রিয়াকরণ, বিল অনুমোদন কিংবা প্রশাসনিক অনুমতির মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম ও হয়রানির অভিযোগ করে আসছেন বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ী, আমদানিকারক, রপ্তানিকারক এবং সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরা।

সেই প্রেক্ষাপটে এবার প্রকাশ্যে কঠোর অবস্থান নিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক)।

মঙ্গলবার (১৬ জুন) চবকের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামানের সই করা এক জরুরি অফিস আদেশে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সতর্ক করে বলা হয়েছে, কোনো ধরনের ঘুষ বা অনৈতিক লেনদেনের অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে চাকরিচ্যুতিসহ সর্বোচ্চ প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

একই সঙ্গে কোনো ঠিকাদার বা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বিল পাস বা ফাইল দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্দেশ্যে আর্থিক সুবিধা বা উপহার দিলে কিংবা দেওয়ার চেষ্টা করলেও তাৎক্ষণিকভাবে কালো তালিকাভুক্ত (ব্ল্যাকলিস্ট) করা হবে।

চবকের ভারপ্রাপ্ত সচিবের দায়িত্বে থাকা মো. নাসির উদ্দিন গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

কেন এ নির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ:
চট্টগ্রাম বন্দর দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার।

আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমের বড় অংশই এ বন্দরের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। ফলে বন্দরের প্রশাসনিক কার্যক্রমে সামান্য বিলম্বও ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

বন্দরসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, কিছু ক্ষেত্রে ফাইল অযথা আটকে রাখা, কৃত্রিম জটিলতা তৈরি করা বা বিভিন্ন অজুহাতে বিলম্ব ঘটিয়ে আর্থিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করা হয়।

এমন অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে থাকলেও প্রকাশ্যে এত স্পষ্ট ভাষায় কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ঠিকাদার—উভয় পক্ষকে একসঙ্গে সতর্ক করার ঘটনা তুলনামূলকভাবে বিরল।

শুধু কর্মচারী নয়, বার্তা ঠিকাদারদের প্রতিও:
এ আদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ঘুষ গ্রহণের পাশাপাশি ঘুষ দেওয়ার চেষ্টাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সাধারণত দুর্নীতির আলোচনায় দায়বদ্ধতার প্রশ্ন কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের দিকে বেশি যায়। কিন্তু চবকের সাম্প্রতিক নির্দেশনায় ঠিকাদার ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকেও সরাসরি দায়ের আওতায় আনা হয়েছে।

এর মাধ্যমে বন্দর কর্তৃপক্ষ বোঝাতে চেয়েছে, অনৈতিক লেনদেন একটি দ্বিমুখী প্রক্রিয়া এবং এটি বন্ধ করতে হলে উভয় পক্ষের বিরুদ্ধে সমান কঠোরতা প্রয়োজন।

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার পরীক্ষা:
অফিস আদেশে শতভাগ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। তবে প্রশাসনিক নির্দেশনা জারি করাই শেষ কথা নয়; এর কার্যকর বাস্তবায়নই হবে বড় পরীক্ষা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্নীতি দমনে শুধু শাস্তির ঘোষণা যথেষ্ট নয়। অভিযোগ গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থা, নিরপেক্ষ তদন্ত, অভিযোগকারীর নিরাপত্তা এবং তদন্তের ফলাফল প্রকাশ—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায় অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করতে উৎসাহ পান না।

অভিযোগ জানানোর আহ্বান:
চবক জানিয়েছে, কোনো কর্মকর্তা বা শাখার বিরুদ্ধে হয়রানি, ঘুষের দাবি কিংবা অনৈতিক আচরণের অভিযোগ থাকলে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণসহ লিখিত অভিযোগ করতে পারবেন বন্দর ব্যবহারকারী ও সেবাগ্রহীতারা।

এ উদ্যোগের সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করবে অভিযোগ ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর।

অভিযোগকারীরা যদি মনে করেন যে তাঁদের তথ্য গোপন থাকবে এবং অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত হবে, তবে অনিয়মের তথ্য আরও বেশি সামনে আসতে পারে।

অংশীজনদের প্রত্যাশা:
বন্দরসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও সাধারণ অংশীজনেরা বন্দর কর্তৃপক্ষের এই প্রকাশ্য ও কঠোর অবস্থানকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।

তাঁদের প্রত্যাশা, ঘোষণাটি কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তবে প্রয়োগ হবে।

কারণ দেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে বাণিজ্য ব্যয় কমবে, সেবার গতি বাড়বে এবং বন্দর ব্যবস্থাপনার প্রতি আস্থা আরও জোরদার হবে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ নির্দেশনা তাই শুধু একটি প্রশাসনিক আদেশ নয়; এটি বন্দরে দীর্ঘদিনের অভিযোগ ও অসন্তোষের বিরুদ্ধে একটি প্রকাশ্য অবস্থান।

এখন নজর থাকবে—ঘোষিত ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা যায়।