২০০৬-এর প্রতিশোধ, ২০২৬-এর স্বপ্ন-ফাইনালে স্পেন

প্রকাশিত: ১৫ জুলাই, ২০২৬ ১১:২১

বিশ্বকাপের শুরু থেকেই একটি প্রশ্ন যেন ফুটবলবিশ্বের আলোচনায় ঘুরপাক খাচ্ছিল-ফ্রান্সকে আটকাবে কে?

কিলিয়ান এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলেদের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে একের পর এক প্রতিপক্ষকে হারিয়ে শিরোপার সবচেয়ে বড় দাবিদার হয়ে উঠেছিল দিদিয়ের দেশমের দল।

মনে হচ্ছিল, বিশ্বকাপের মঞ্চ যেন আবারও ফরাসিদের জন্যই প্রস্তুত। কিন্তু ফুটবলের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্যই হলো-এখানে শেষ কথা বলে মাঠের লড়াই।

ডালাসে অনুষ্ঠিত প্রথম সেমিফাইনালে সেই অপ্রতিরোধ্য ফ্রান্সকে ২–০ গোলে হারিয়ে ১৬ বছর পর আবারও বিশ্বকাপের ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে স্পেন।

পরিকল্পিত, পরিণত ও আত্মবিশ্বাসী ফুটবল খেলে ইউরোপের আরেক শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে কার্যত নিষ্প্রভ করে দেয় লা রোহা। শিরোপা পুনরুদ্ধারের স্বপ্নে তারা এগিয়ে গেল আরেক ধাপ।

জয়ের পর আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন স্পেনের বিস্ময়বালক লামিনে ইয়ামালও। ম্যাচ শেষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দুই হাত তোলা একটি ছবি পোস্ট করেন তিনি।

ক্যাপশনে ছিল মাত্র একটি শব্দ-‘আলহামদুলিল্লাহ’। মুহূর্তেই সেই পোস্ট ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমজুড়ে।

২০১০ সালে প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র বিশ্বকাপ জিতেছিল স্পেন। জাভি হার্নান্দেজ, আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা, সার্জিও রামোস, জেরার্ড পিকে ও ইকার ক্যাসিয়াসদের সেই সোনালি প্রজন্মের পর আবারও বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠল লা রোহা।

এবার নতুন প্রজন্ম কি এনে দিতে পারবে দ্বিতীয় বিশ্বজয়ের আনন্দ-সেই প্রশ্নের উত্তর মিলবে ফাইনালে।

ম্যাচের শুরু থেকেই নিজেদের পরিকল্পনার ছাপ রাখে স্পেন। বলের দখল, পাসিং আর আক্রমণ-সব দিকেই ফ্রান্সকে চাপে রাখে তারা। এরই ফল আসে ২২তম মিনিটে। ফরাসি বক্সে ফাউলের শিকার হন ইয়ামাল।

বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে তাঁর পায়ে জোরে আঘাত করেন লুকাস দিনিয়ে। রেফারি সঙ্গে সঙ্গেই পেনাল্টির বাঁশি বাজান।

স্পট কিক থেকে কোনো ভুল করেননি মিকেল ওইয়ারসাবাল। ফ্রান্সের গোলরক্ষক মাইক মাইনিয়ঁ বাঁ দিকে ঝাঁপ দিলেও জোরালো শটটি তাঁর নাগালের বাইরে দিয়ে জালে জড়িয়ে যায়। ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় স্পেন।

গোল হজমের পর ম্যাচে ফেরার চেষ্টা চালায় ফ্রান্স। প্রথমার্ধে কয়েকবার স্পেনের রক্ষণে চাপ তৈরি করলেও সমতার গোলের দেখা পায়নি দেশমের শিষ্যরা। বরং বিরতির পর আরও বড় ধাক্কা অপেক্ষা করছিল তাদের জন্য।

৫৮তম মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন পেদ্রো পোরো। দানি ওলমোর সঙ্গে দ্রুত ওয়ান-টু পাস খেলে বল নিয়ে ফরাসি বক্সে ঢুকে পড়েন তিনি। এরপর দুর্দান্ত এক শটে মাইনিয়ঁকে পরাস্ত করে স্পেনকে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন পোরো।

ছয় মিনিট পর বল জালে জড়িয়েছিলেন ইয়ামালও। তবে অফসাইডের কারণে বাতিল হয়ে যায় তাঁর গোল।

এরপর ম্যাচে ফিরতে একাধিক সুযোগ তৈরি করলেও গোলের দেখা পায়নি ফ্রান্স। সময় যত গড়িয়েছে, ততই ছন্দ হারিয়েছে তাদের ফুটবল।

ফিনিশিংয়ে দুর্বলতা, অগোছালো মধ্যমাঠ এবং নড়বড়ে রক্ষণ-সব মিলিয়ে সেমিফাইনালের মঞ্চে চেনা ফ্রান্সকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। এমবাপ্পে ও দেম্বেলেদের আক্রমণও স্পেনের সুসংগঠিত রক্ষণ ভাঙতে পারেনি।

যে দলটিকে পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে সবচেয়ে ভয়ংকর মনে হচ্ছিল, শেষ পর্যন্ত সেই ফ্রান্সকেই দেখা গেল অসহায়। অন্যদিকে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে প্রাপ্য জয় নিশ্চিত করেছে স্পেন।

বিশ্বকাপে এটি ছিল স্পেন ও ফ্রান্সের দ্বিতীয় মুখোমুখি লড়াই। এর আগে ২০০৬ জার্মানি বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় দেখা হয়েছিল দুই দলের।

সেবার পিছিয়ে পড়েও ৩-১ গোলে জয় পেয়েছিল ফ্রান্স। প্রায় দুই দশক পর সেই হারের জবাবটা দারুণভাবেই দিল স্পেন।

সেমিফাইনালের ইতিহাসও ছিল স্পেনের পক্ষে। ২০১০ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর টানা তিন আসরে শেষ চারেই উঠতে পারেনি তারা। তবে এবার সেমিফাইনালে ফিরেই বড় আসরের নিজেদের সফল ঐতিহ্য ধরে রাখল লা রোহা।

বড় প্রতিযোগিতার সেমিফাইনালে স্পেনের ব্যর্থতার নজির খুবই কম। আগের সাতটি সেমিফাইনালের মধ্যে মাত্র একবার-২০২০ ইউরোয়-বিদায় নিয়েছিল তারা। বাকি ছয়বারই জায়গা করে নিয়েছিল ফাইনালে। এবারও সেই ধারাবাহিকতায় যোগ হলো নতুন অধ্যায়।

১৬ বছরের অপেক্ষা শেষে আবারও বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেন। শিরোপার শেষ লড়াইয়ে তাদের প্রতিপক্ষ কে হবে, সেটি জানতে অপেক্ষা আর ২৪ ঘণ্টারও কম।

তবে একটি বার্তা তারা ইতিমধ্যেই পরিষ্কার করে দিয়েছে-যেভাবে ফ্রান্সকে থামিয়েছে, তাতে বিশ্বকাপের ট্রফি জয়ের লড়াইয়ে স্পেন যে পুরোপুরি প্রস্তুত, তা নিয়ে আর কোনো সন্দেহ নেই।