দরিদ্রতার দীর্ঘশ্বাস আর বানের জলে ভাসা খাগরিয়া: যেখানে ত্রাণের চেয়ে বেশি মিলছে মানবিকতা

প্রকাশিত: ১৬ জুলাই, ২০২৬ ১৫:১২

বিশেষ প্রতিবেদন |

ভৌগোলিক সীমারেখা ছাপিয়ে যখন কোনো মানবিক বিপর্যয় তীব্র হয়ে ওঠে, তখন কেবল সংখ্যা দিয়ে তার গভীরতা মাপা যায় না। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চল বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলা এখন তেমনই এক রূপ নিয়েছে। সাম্প্রতিক প্রলয়ংকরী বন্যায় প্লাবিত চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও বাঁশখালী উপজেলার বিস্তীর্ণ জনপদ। ঘরবাড়ি হারিয়ে, ফসলের খেত জলের নিচে তলিয়ে যাওয়া হাজারো মানুষের চোখে এখন কেবলই বেঁচে থাকার আকুতি।

এই চরম সংকটের মুহূর্তে, রাষ্ট্র কিংবা বড় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর আনুষ্ঠানিক তৎপরতার সমান্তরালে, স্থানীয় পর্যায়ে গড়ে উঠছে এক অনন্য মানবিক প্রতিরোধ। গত ১৫ জুলাই ২০২৬, চট্টগ্রামের খাগরিয়া ইউনিয়নে জামায়াতে ইসলামীর উদ্যোগে বানের জলে সর্বস্ব হারানো পরিবারগুলোর মাঝে যখন উপহারসামগ্রী (জরুরি খাদ্য ও রসদ) বিতরণ করা হচ্ছিল, তখন সেখানে কোনো আনুষ্ঠানিকতার জাঁকজমক ছিল না; ছিল কেবলই বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক পরম আর্ত্তি।

ত্রাণ বিতরণ কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা জামায়াতের আমীর আনোয়ারুল আলম চৌধুরী যে বার্তাটি দিয়েছেন, তা কেবল একটি রাজনৈতিক বা সামাজিক সংগঠনের বক্তব্য নয়, বরং তা হয়ে উঠেছে এই মুহূর্তে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের চরম সংকটে পড়া মানবতার এক চিরন্তন আহ্বান।

ক্ষতিগ্রস্তদের হাতে উপহারসামগ্রী তুলে দেওয়ার সময় আনোয়ারুল আলম চৌধুরী এক আবেগঘন কণ্ঠে উপস্থিত দায়িত্বশীলদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, “এই দুর্যোগে আমাদের আশপাশের কোনো পরিবার যেন অন্তত খাবারের কষ্টে না ভোগে। শুধু দূর থেকে ত্রাণ আসার অপেক্ষায় না থেকে, আসুন আমরা প্রত্যেকে নিজের সাধ্যমতো পাশের মানুষটির খোঁজ নিই।”

তার এই একটি বাক্যই যেন ফুটিয়ে তুলেছে বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা ও এর বিপরীতে মানুষের করণীয়। তিনি অকপটে স্বীকার করেন, সাতকানিয়া ও বাঁশখালী উপজেলায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এতটাই প্রকট যে, বিপুল চাহিদার তুলনায় যেকোনো প্রাতিষ্ঠানিক সাহায্যই এখন অপ্রতুল। আর ঠিক এই কারণেই তিনি আহ্বান জানিয়েছেন সমাজের বিত্তবান ও সামর্থ্যবানদের প্রতি—যাঁরা একসময় দূর-দূরান্তে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেন, তাঁরা যেন এখন ঘরের ঠিক পাশে, নিজের প্রতিবেশীর বুকফাটা আর্তনাদে সাড়া দেন।

এই মানবিক উদ্যোগের পেছনে স্থানীয় নেতৃত্বের একতাও ছিল চোখে পড়ার মতো। উত্তর সাতকানিয়া সাংগু থানার সেক্রেটারি মুহাম্মদ ইলিয়াছ, প্রশিক্ষণ সেক্রেটারি হাফেজ এয়ার মোহাম্মদ, অফিস সেক্রেটারি মাওলানা জমির আদনান, খাগরিয়া ইউনিয়নের আমীর আবুল খায়ের, প্রবাসী ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক মাওলানা আবদুল মালেক এবং ইউনিয়ন সেক্রেটারি মাওলানা মাছুম সহ স্থানীয় স্তরের ব্যক্তিবর্গ প্রত্যন্ত অঞ্চলের কাদা-পানি মাড়িয়ে পৌঁছে গেছেন দুর্গতদের দুয়ারে।

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার বড় বড় তত্ত্ব যখন কেবলই ফান্ডিং আর লজিস্টিকসের মারপ্যাঁচে আটকে থাকে, তখন খাগরিয়ার এই খণ্ডচিত্র মনে করিয়ে দেয়—দিনশেষে মানুষের পাশে মানুষের দাঁড়ানোটাই সবচেয়ে বড় ত্রাণ। যে খাগরিয়া আজ জলের নিচে, সেখানকার প্রতিটি ঘরে এখন ক্ষুধার চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে সহমর্মিতার তৃষ্ণা। বানের জলের তোড়ে সব ভেসে গেলেও, একে অপরের হাত ধরে বেঁচে থাকার এই মানবিক লড়াই বিশ্ববাসীকে এক নতুন আশার আলো দেখায়।