আখাউড়া–শায়েস্তাগঞ্জে তিন বছর ধরে ৮ কর্মীর নামে বছরে প্রায় ২২ লাখ টাকা উত্তোলনের অভিযোগ, শিক্ষার্থীও রেলের কর্মচারী, নিয়ম না মেনে যোগদান ও দায়িত্ব বণ্টনে অনিয়মের অভিযোগ।
রেলের খাতায় তারা কর্মচারী। মাস শেষে তাদের নামে হাজিরা হয়, বেতন-ভাতার বিলও তৈরি হয়। কিন্তু বাস্তবে কর্মস্থলে তাদের দেখা মেলে না। কেউ শিক্ষার্থী, কেউ নিয়মিত দায়িত্ব পালন করেন না-তবু কাগজে-কলমে তারা বাংলাদেশ রেলওয়ের কর্মী।
এভাবেই পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের আটটি পদে বাস্তবে কর্মরত না থাকা আটজনের নামে বছরের পর বছর বেতন-ভাতা উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া বাইপাস লাইনে সাতজন টিএলআর এবং হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ এসএসএই (ওয়ে) দপ্তরে একজন চৌকিদারের পদ ঘিরে চলছে এই ‘গায়েবি’ কর্মচারীর কারবার।
আটজনের নামে বছরে প্রায় ২২ লাখ টাকা বেতন-ভাতা উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, এ ঘটনা এক-দুই মাসের নয়। অভিযোগ রয়েছে, অন্তত তিন বছর ধরে একই কায়দায় চলছে এই কার্যক্রম। অর্থাৎ অভিযোগ সত্য হলে, শুধু এক বছরের নয়-তিন বছরে এর আর্থিক পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৬৬ লাখ টাকা।
প্রশ্ন উঠছে, কর্মী যেখানে নেই, সেখানে হাজিরা তৈরি হয় কীভাবে? বেতন বিলই বা তৈরি করেন কারা? আর সেই অর্থের শেষ গন্তব্য কোথায়?
অভিযোগের তীর গিয়ে পড়েছে রেলওয়ের সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী (আখাউড়া) আবু হানিফ পাশার নেতৃত্বাধীন একটি কথিত সিন্ডিকেটের দিকে।
অভিযোগকারীদের দাবি, ভুয়া বা অস্তিত্বহীন কর্মচারীদের নামে উত্তোলিত বেতন-ভাতার টাকা ভাগবাটোয়ারা করে নেওয়া হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ঢাকা বিভাগীয় প্রকৌশল অফিসের অধীন সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী (আখাউড়া) দপ্তরের আওতায় অন্তত তিন বছর ধরে সাতজন টিএলআরের নামে বেতন তোলার অভিযোগ রয়েছে।
রেলওয়ের প্রকৌশল বিভাগের সংশ্লিষ্টদের কাছে বিষয়টি ‘ওপেন সিক্রেট’ হলেও বেতন বিল তৈরির প্রক্রিয়া চলে অত্যন্ত গোপনে-এমন অভিযোগ রয়েছে।
প্রতি মাসে বেতন বিল তৈরির শেষের এক দিনের মধ্যে বিল-সংক্রান্ত কাজ শেষ করা হয়। এরপর ফাইলটি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ড্রয়ারে তালাবদ্ধ করে রাখা হয় বলে অভিযোগ।
ফলে কর্মচারীদের মধ্যে ভুয়া কর্মচারীদের নামে বেতন উত্তোলনের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা থাকলেও মূল নথি সহজে পাওয়া যায় না।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, নথি গোপন রাখার এই প্রক্রিয়াই পুরো ব্যবস্থাকে আড়াল করার অন্যতম উপায়।
একজন শিক্ষার্থী, তবু রেলের কর্মচারী!
আট ভুয়া কর্মচারীর নামের তালিকা সংগ্রহের চেষ্টা করে প্রতিবেদক। এর মধ্যে অন্তত তিনজনের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
শায়েস্তাগঞ্জ পিডব্লিউআই দপ্তরে টিএলআর চৌকিদার পোস্টে মাহমুদুল হাসানের নামে বেতন পাওয়ার তথ্য রয়েছে। তিনি ওয়েম্যান ওসমান গনির ছেলে।
অভিযোগের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো-মাহমুদুল হাসান প্রকৃতপক্ষে একজন শিক্ষার্থী। তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিতির রেকর্ড রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। অথচ রেলের নথিতে তিনি কর্মচারী এবং তার নামে নিয়মিত বেতন উত্তোলন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ।
অভিযোগকারীদের দাবি, মাহমুদুল হাসানের নামে উত্তোলিত অর্থ পরে রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কথিত সিন্ডিকেটের কাছে চলে যায়।
আখাউড়া বাইপাস লাইনে রুকন উদ্দীন ও আমীর হোসেন নামে আরও দুই ব্যক্তির নামে টিএলআর বিল তৈরি হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
এখানেই তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সামনে আসে-যদি এসব ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে কর্মস্থলে কাজ না করেন, তাহলে তাদের নিয়োগ, হাজিরা, বেতন বিল এবং অর্থ উত্তোলনের প্রতিটি ধাপে কারা যুক্ত?
আখাউড়ার সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলীর দপ্তর ঘিরে অভিযোগ শুধু ‘গায়েবি’ কর্মচারীর বেতন উত্তোলনেই সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন প্রকল্প, প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক কার্যক্রমেও ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগী ও শ্রমিকদের অভিযোগ, দায়িত্ব বণ্টন, দপ্তরাদেশ, কর্মচারীদের দায়িত্ব প্রদান, পুনর্বহাল এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটানো হয়েছে।
এ জন্য রেলওয়ের ঢাকা বিভাগীয় প্রকৌশলী-২ আহসান হাবিব এবং সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী আবু হানিফ পাশাকে দায়ী করেছেন অভিযোগকারীরা।
তাদের বিরুদ্ধে ঘুষ ও বদলি-বাণিজ্যের মাধ্যমে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করার অভিযোগও রয়েছে।
রেলওয়ে শ্রমিক নেতাদের দাবি, প্রশাসনিক অনিয়ম বন্ধের পাশাপাশি ঘুষ, বদলি-বাণিজ্য ও শ্রমিক হয়রানি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
আখাউড়া-শায়েস্তাগঞ্জ রেলওয়ে দপ্তরের আরেকটি আলোচিত ঘটনা শায়েস্তাগঞ্জ রেলওয়ে শ্রমিক লীগের প্রচার সম্পাদক বাদল খানের চাকরিতে যোগদান।
জানা গেছে, চার মাসের বেশি সময় কারাগারে থাকায় বাদল খান ছয় মাস ২০ দিন সাময়িক বরখাস্ত ছিলেন। ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর গ্রেপ্তার হয়ে তিনি কারাগারে যান। পরে চলতি বছরের ৮ জুলাই চাকরিতে যোগদান করেন।
অভিযোগ উঠেছে, চাকরিতে যোগদানের আগে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত, আইন শাখার মতামত এবং স্বাস্থ্যগত সক্ষমতা যাচাই করা হয়নি। এমনকি বাধ্যতামূলক হওয়া সত্ত্বেও রেলওয়ে মেডিক্যাল সার্টিফিকেট-আরএমসি নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ।
কারাগার থেকে মুক্তির পর বাদল খান অসুস্থ ছিলেন বলেও জানা গেছে। ফলে তার শারীরিক সক্ষমতা যাচাইয়ের বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
রেলওয়ে শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক এমআর মনজু বলেন, এভাবে এত সহজে যোগদান করার কথা নয়। যেসব কর্মকর্তা শ্রমিক লীগকে পুনর্বাসন করছেন, তারাও ফ্যাসিস্টের লোক বলে দাবি করেন তিনি।
প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ে আরেকটি প্রশ্ন উঠেছে টাইমকিপার ইসরাইল মিয়াকে ঘিরে।
অভিযোগ রয়েছে, আখাউড়ার সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলীর দপ্তরে দুইজন স্থায়ী সিনিয়র অফিস সহকারী-কাম-কম্পিউটার অপারেটর কর্মরত থাকা সত্ত্বেও ব্লক পোস্টের টাইমকিপার ইসরাইল মিয়াকে উচ্চমান সহকারীর ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের দাবি, জ্যেষ্ঠ কর্মচারীদের উপেক্ষা করে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
ইসরাইল মিয়ার বিরুদ্ধে শ্রমিকদের বিভিন্ন কাজ দীর্ঘদিন আটকে রাখা, ফাইল নিষ্পত্তিতে বিলম্ব এবং অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক শ্রমিক বলেন, সংস্থাপন-সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজে ইসরাইল মিয়ার ওপর নির্ভর করতে হয়। টাকা না দিলে কাজ আটকে রাখার অভিযোগও করেন তারা।
জানা গেছে, ইসরাইল মিয়ার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে বিভাগীয় পর্যায়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে রেলওয়ে।
আখাউড়া প্রকৌশল বিভাগে দাপ্তরিক দায়িত্ব বণ্টন নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন।
অভিযোগ রয়েছে, চৌকিদার মতিউর রহমানকে দপ্তরাদেশের মাধ্যমে ডেসপাচ-সংক্রান্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কোনো লিখিত দপ্তরাদেশ ছাড়াই ওয়েম্যান মামুনুর রশিদকে চৌকিদারের দায়িত্ব পালন করানো হচ্ছে।
এখানেই শেষ নয়। আখাউড়া ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী দপ্তরের কর্মচারী না হয়েও ফরহাদ নামে এক ব্যক্তি দাপ্তরিক কাজ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এর মাধ্যমে ফরহাদ দাপ্তরিক বিভিন্ন কাজে প্রভাব বিস্তার করছেন এবং কর্মচারীদের ওপরও প্রভাব খাটাচ্ছেন।
কুলসুম বেগম নামে এক কর্মচারীর বিরুদ্ধেও দীর্ঘ সময় কর্মস্থলে উপস্থিত না থাকার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় কর্মস্থলে উপস্থিত না থাকলেও তিনি নিয়মিত বেতন-ভাতা পেয়েছেন। বছরের পর বছর তাকে বাসায় বসিয়ে বেতন দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বিষয়টি ঢাকা বিভাগীয় প্রকৌশলী-২ আহসান হাবিব এবং সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী আবু হানিফ পাশাকে জানানো হলেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
ওয়েম্যান ওসমান গনির বিরুদ্ধেও নিয়মিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি নিয়মিত গ্যাংয়ের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করে অফিসের অন্যান্য কাজে নিয়োজিত থাকেন। শ্রমিকদের বিভিন্ন কাজে প্রভাব বিস্তার এবং ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
একই দপ্তরের কর্মচারী জুনায়েদ মিয়া বলেন, ওয়েম্যান ওসমান গনির হাজিরা গ্যাংয়ে থাকলেও কর্মকর্তাদের সম্মতিতে তিনি অফিসে থাকেন।
জুনায়েদের অভিযোগ, শ্রমিকদের জিম্মি করে কল্যাণ ট্রাস্টের টাকার কথা বলে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হয়।
সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী (আখাউড়া) আবু হানিফ পাশা বলেন, তিনি নতুন এসেছেন এবং এখনো সবকিছু বুঝে উঠতে পারেননি। তবে ঘরে বসে বেতন নেওয়ার কোনো ঘটনা নেই বলে দাবি করেন তিনি।
অন্যান্য অভিযোগও খতিয়ে দেখছেন বলে জানান। ইসরাইল মিয়ার বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে বলেও তিনি জানান।
বিভাগীয় প্রকৌশলী-২ আহসান হাবীব তার বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী তানভীরুল ইসলাম বলেন, শ্রমিক লীগ নেতা বাদলের যোগদান প্রক্রিয়া ঠিক হয়নি। তার ক্ষেত্রে আইনি মতামত এবং আরএমসি নেওয়ার প্রয়োজন ছিল।
সব অভিযোগ খতিয়ে দেখা হবে এবং অনিয়মে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
