রেলওয়ের লোকোমোটিভ সচল রাখতে জার্মানির বিখ্যাত ‘ডয়েজ ডিজেল ইঞ্জিন’-এর যন্ত্রাংশ প্রয়োজন ছিল। বৈদ্যুতিক বিভাগের জন্য আনাও হলো ১৪ আইটেমের স্পেয়ার পার্টস।
কিন্তু রেলের চাকা ঘোরার আগেই সচল হয়ে উঠল এক অবিশ্বাস্য দুর্নীতির চাকা।
যে যন্ত্রাংশগুলোর প্রকৃত বাজারমূল্য মাত্র ১ কোটি টাকা, রেলের নথিতে তা রাতারাতি হয়ে গেল ৮ কোটি টাকা! চোখের পলকে সরকারের কোষাগার থেকে উধাও হয়ে গেল অতিরিক্ত ৭ কোটি টাকা।
নজিরবিহীন এই জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে এবার মাঠে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
এই হরিলুটের নেপথ্যে থাকা রেলের অসাধু কর্মকর্তা ও ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের টুঁটি চেপে ধরতে তৎপর হয়েছেন অনুসন্ধানকারীরা।
নজরদারিতে প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রকের দপ্তর
দুদক সূত্রে জানা গেছে, এই বিপুল অঙ্কের টাকা স্রেফ কাগজপত্রের কারসাজিতে সরকারের পকেট কেটে তুলে নেওয়া হয়েছে।
আর এই কেনাকাটায় মূল ‘ইঞ্জিন’ হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রকের দপ্তর।
দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রধান কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. নাজমুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে ইতিমধ্যে এই কেনাকাটাসংক্রান্ত যাবতীয় নথি তলব করা হয়েছে।
গত ২১ জুন পাঠানো ওই চিঠিতে রেলওয়েকে আগামী ২২ জুলাইয়ের মধ্যে সমস্ত নথির সত্যায়িত অনুলিপি জমা দেওয়ার জন্য কঠোর সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে তথ্য না দিলে আইনি অ্যাকশনে যাবে কমিশন।
ইতিমধ্যে দরপত্র পদ্ধতি অনুমোদনের পরিপত্র ও বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা, বাজারদর এবং অনুমোদিত দাপ্তরিক প্রাক্কলনের মূল চিঠি, দরপত্র মূল্যায়ন প্রতিবেদন (TER), কৃতকার্য দরদাতার ট্রেড লাইসেন্স, এনআইডি, ভ্যাট-আইটি সার্টিফিকেট ও অভিজ্ঞতার সনদ, নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড (NOA) ও মালামাল সরবরাহসংক্রান্ত সব তথ্য তলব করেছে দুদক।
ই-জিপির আড়ালে তিন টেন্ডারের জালিয়াতি
ডিজিটাল বাংলাদেশে কেনাকাটায় স্বচ্ছতা আনতে চালু হয়েছিল ই-জিপি (e-GP)। কিন্তু চোরের দল সেখানেও সুড়ঙ্গ কেটেছে।
জানা গেছে, সরঞ্জাম বিভাগ থেকে তিনটি ই-জিপি টেন্ডার আইডির মাধ্যমে এই ১৪টি আইটেমের ডয়েজ ডিজেল ইঞ্জিনের পার্টস কেনা হয়।
বাজারমূল্যের চেয়ে ৮ গুণ বেশি দাম দেখিয়ে বিল পাস করিয়ে নেওয়া হয়।
অভিযোগ রয়েছে, এই অতিরিক্ত ৭ কোটি টাকা সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী ঠিকাদার এবং রেলের কর্তাব্যক্তিরা নিজেদের মধ্যে সুষম বণ্টন বা ‘ভাগ-বাঁটোয়ারা’ করে নিয়েছেন।
এই বিষয়ে জানতে রেলওয়ের প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক বেলাল হোসেন সরকারের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয় এবং হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হয়। কিন্তু তিনি রহস্যজনকভাবে নীরব রয়েছেন, কোনো সাড়া দেননি।
লুটপাটের চেনা সিন্ডিকেট রেলের সরঞ্জাম কেনাকাটায় এই লুটপাট কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি বছরের পর বছর ধরে চলা এক প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাধি।
২০২৩ সালে রেলের পশ্চিমাঞ্চলের সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে ৭ কোটি টাকা লুটপাটের অনুসন্ধান চালায় দুদক।
২০২৪ সালেও একই কার্যালয় অপ্রয়োজনীয় অতিরিক্ত যন্ত্রাংশ কিনে সরকারের দেড় কোটি টাকা অপচয় করে, যা পরিবহন অডিট প্রতিবেদনে প্রমাণিত।
পূর্বাঞ্চল (সিআরবি)তে গত তিন বছর ধরে বাজারদরের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি দামে বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম কেনার উৎসব চলছে এখানে।
২০২৪ সালেও লিফটিং জ্যাক, ড্রিলিং মেশিন ও কাটিং জ্যাকের মতো গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ কিনতে প্রাক্কলিত ব্যয়ের চেয়ে ১৭-১৮ লাখ টাকা বেশি ওড়ানোর প্রমাণ পেয়েছে অডিট বিভাগ।
রেলওয়ের পূর্বাঞ্চল কার্যালয়ে (সিআরবি) টেন্ডার জালিয়াতি আর বাজারমূল্য নির্ধারণে পুকুরচুরির অভিযোগে চট্টগ্রাম জেলা দুদক কার্যালয় একাধিকবার ঝটিকা অভিযান চালিয়েছে।
খোদ রেলের অভ্যন্তরীণ তদন্তেই একাধিক কর্মকর্তা ইতিপূর্বে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন।
কিন্তু অলৌকিক এক ক্ষমতার জোরে শাস্তি পাওয়া তো দূরের কথা, উল্টো তাদের অনেকে পদোন্নতি পেয়ে বহাল তবিয়তে আছেন। ফলে দুর্নীতিবাজদের সাহস এখন আকাশচুম্বী।
সার্বিক অনিয়ম ও ডয়েজ ইঞ্জিনের পার্টস লুটের বিষয়ে কথা বলতে রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) ফকির মো. মহিউদ্দিনের দপ্তরে যাওয়ার অনুমতি চাওয়া হয়েছিল। তবে তিনিও এই স্পর্শকাতর বিষয়ে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। সূত্র-খবরের কাগজ
রেলের ইঞ্জিন জোড়াতালি দিয়ে চললেও দুর্নীতির ইঞ্জিন চলছে ফুল স্পিডে। এখন দেখার বিষয়, আগামী ২২ জুলাই দুদক যে নথিপত্র তলব করেছে, সেখানে কোন কোন রাঘববোয়ালের নাম বেরিয়ে আসে।
জনতা ট্যাক্স দেয় রেলের অগ্রগতির জন্য, কর্মকর্তাদের পকেট ভারী করার জন্য নয়-এই সত্যটি কর্তৃপক্ষ যত দ্রুত বুঝবে, রেলের জন্য ততই মঙ্গল।
