অফিসে প্রায় সময় আসেন দামি টয়োটা ল্যান্ডক্রুজার ডাবল কেবিন পিকআপে। অথচ তিনি বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের প্রধান সংস্থাপন কর্মকর্তার (সিপিও) কার্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির একজন কর্মচারী।
একই দপ্তরে টানা ২৩ বছর চাকরি, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাব, সহকর্মীদের ওপর কর্তৃত্ব বিস্তারের অভিযোগ, অস্বাভাবিক সম্পদের প্রশ্ন এবং সরকারি গাড়ি ব্যবহারের বিতর্ক-সব মিলিয়ে রেলওয়ের কর্মচারী লুৎফা বেগমকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
রেলওয়ের নথি অনুযায়ী, ২০০৪ সালে পূর্বাঞ্চলের প্রধান সংস্থাপন কর্মকর্তার কার্যালয়ে যোগ দেন লুৎফা বেগম। এরপর ২০২৬ সাল পর্যন্ত কোনো বদলি ছাড়াই তিনি একই দপ্তরে কর্মরত রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেকের প্রশ্ন, দীর্ঘ ২৩ বছর একই গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দপ্তরে একজন কর্মচারী কীভাবে বহাল থাকলেন? এই দীর্ঘ অবস্থান কি তাঁকে একটি শক্তিশালী প্রভাববলয় গড়ে তোলার সুযোগ দিয়েছে?
অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন একই দপ্তরে থাকার সুবাদে লুৎফা বেগম সেখানে একটি শক্তিশালী নিজস্ব বলয় তৈরি করেছেন।
বদলি, নিয়োগ, পেনশন, সাময়িক বরখাস্তসংক্রান্ত ফাইল, মুক্তিযোদ্ধা কোটাসংক্রান্ত বিষয় এবং টিএলআর নিয়োগসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রমে তাঁর প্রভাব রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বাংলাদেশ রেলওয়ের মতো বড় সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশাসনিক প্রয়োজনে এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে বদলির ঘটনা স্বাভাবিক। কিন্তু রেলওয়ের নথি অনুযায়ী লুৎফা বেগম ২০০৪ সালে সিপিও (পূর্ব) কার্যালয়ে যোগ দেওয়ার পর দীর্ঘ সময় একই দপ্তরে বহাল রয়েছেন।
রেলওয়ের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর দাবি, এত দীর্ঘ সময় একই প্রশাসনিক দপ্তরে অবস্থান করার সুযোগকে কেন্দ্র করেই তাঁর প্রভাব ক্রমে বাড়তে থাকে।
তাঁদের ভাষ্য, প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ও সিদ্ধান্তের সঙ্গে দীর্ঘদিন সম্পৃক্ত থাকার কারণে তিনি এমন একটি অবস্থানে পৌঁছেছেন, যেখানে অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী তাঁর সঙ্গে বিরোধে যেতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না।
রেলওয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দীর্ঘ সময় একই জায়গায় থাকা কোনো কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তা প্রশাসনিকভাবে গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তাঁর ভাষায়, ‘প্রশাসনের নীরবতার কারণে অনেক সময় কিছু কর্মচারী প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। পরে তাঁরা রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহার করে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখেন। এটি চাকরির শৃঙ্খলার জন্য ভালো বার্তা নয়।
সম্পদের প্রশ্ন
রেলওয়ের বিভিন্ন সূত্রের অভিযোগ, স্বল্প বেতনের চাকরি করলেও লুৎফা বেগমের নামে ও পরিবারের সদস্যদের নামে একাধিক ফ্ল্যাট ও বাড়ি রয়েছে।
সূত্রগুলোর দাবি, চট্টগ্রামের হালিশহর থানার কৃষ্ণচূড়া অ্যাপার্টমেন্টে তাঁর দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে। নগরীর নালাপাড়াসহ আরও কয়েকটি এলাকায় সম্পত্তি থাকার অভিযোগ রয়েছে। ঢাকায় বাড়ি এবং গ্রামের বাড়িতেও উল্লেখযোগ্য সম্পদের মালিক তিনি-এমন অভিযোগও করেছেন রেলওয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী।
রেলওয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী বলেন, লুৎফা বেগম ও তাঁর পরিবারের সম্পদ নিয়ে নিরপেক্ষ অনুসন্ধান হলে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসবে। তাঁদের দাবি, অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখতে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার তদন্ত প্রয়োজন।
লুৎফা বেগমকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচনা তাঁর অফিসে যাতায়াতের গাড়ি নিয়ে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তিনি টয়োটা ব্র্যান্ডের ৩ হাজার ১৫৩ সিসির ল্যান্ডক্রুজার ডাবল কেবিন পিকআপে করে অফিসে যাতায়াত করেন। গাড়িটির নম্বর ঢাকা মেট্রো-ঠ-১১-৩৫৪৪।
বিআরটিএর ডেটাবেইস থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গাড়িটি ২০০১ সালের ২৯ মার্চ নিবন্ধিত হয়। নিবন্ধনে গাড়িটির মালিক হিসেবে ঢাকা সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ের নাম রয়েছে। ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ রয়েছে ঢাকার রমনায় সড়ক ভবন।
প্রশ্ন উঠেছে, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের নামে নিবন্ধিত একটি সরকারি গাড়ি কীভাবে রেলওয়ের একজন কর্মচারীর নিয়মিত অফিসে যাতায়াতের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে?
এ বিষয়ে লুৎফা বেগমের স্বামী রফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেছেন, গাড়িটি তাঁর নামে বরাদ্দ রয়েছে এবং তিনি সরকারি কাজে এটি ব্যবহার করেন। সূত্র-এপত্রিকা
তিনি বলেন, গাড়িটি আমার নামে বরাদ্দ আছে। এটা আমি অফিশিয়াল কাজে ব্যবহার করে থাকি। এখনো করছি। মাঝেমধ্যে যখন ফ্রি থাকি তখন রেলওয়েতে কর্মরত আমার মিসেসের যাওয়া-আসার জন্য গাড়িটি ব্যবহার করা হয়।
রফিকুল ইসলাম সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের টেকনিক্যাল সার্ভিসেস উইংয়ের সহকারী বৃক্ষপালনবিদ হিসেবে কর্মরত ছিলেন বলে জানা গেছে।
তবে সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, তাঁর পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য সরকারি গাড়ি বরাদ্দ পাওয়ার সুযোগ রাখেন কি না।
গাড়ির ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন করা হলে চট্টগ্রাম বিভাগীয় সড়ক ও জনপথ অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহে আরেফীন গণশাধ্যমকে বলেছেন, সহকারী প্রকৌশলী বা সমমানের কর্মকর্তারা সাধারণত পুলের গাড়ি ব্যবহার করেন। ব্যক্তিগত গাড়ি বরাদ্দ থাকে না। দপ্তরের প্রধানদের জন্য ব্যক্তিগত গাড়ি বরাদ্দ থাকে। তবে যাঁর কথা বলছেন, উনি গাড়িটি কীভাবে ব্যবহার করছেন তা আমি জানি না।
তাঁর এই বক্তব্যের পর সরকারি গাড়িটির বরাদ্দ, ব্যবহার এবং রেলওয়ের একজন কর্মচারীর নিয়মিত যাতায়াতে ব্যবহারের বিষয়টি আরও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, গাড়িটি কোন নীতিমালার আওতায়, কাকে এবং কী শর্তে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল-তা সরকারি নথি যাচাই করে দেখা প্রয়োজন।
রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের অভিযোগ
লুৎফা বেগম দীর্ঘদিন বাংলাদেশ রেলওয়ে শ্রমিক লীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটির মহিলাবিষয়ক সম্পাদক ছিলেন বলে রেলওয়ের বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।
রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে তিনি প্রশাসনে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করেন।
তাঁদের দাবি, তৎকালীন রেলমন্ত্রী মুজিবুল হকের ঘনিষ্ঠতার কারণে তাঁর বিরুদ্ধে প্রশাসনিকভাবে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন ছিল।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা পরিবর্তিত হলেও লুৎফা বেগমের প্রশাসনিক অবস্থানে বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। বরং রেলওয়ে মহাপরিচালকের কার্যালয়ের বিশেষ সহায়তায় তিনি সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তার পদোন্নতি পেয়েছেন-এমন অভিযোগও রয়েছে। এ বিষয়ে রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
দুইবার শোকজের অভিযোগ
রেলওয়ের কয়েকজন কর্মচারীর দাবি, সহকর্মীদের সঙ্গে অশালীন আচরণের অভিযোগে অতীতে লুৎফা বেগমকে দুইবার কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। তাঁদের অভিযোগ, পরবর্তীতে প্রভাবশালী শ্রমিক নেতা ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করে সেই নোটিশগুলো বাতিল করা হয়।
বর্তমানেও তাঁর বিরুদ্ধে সহকর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নাম ব্যবহার করে ভয়ভীতি প্রদর্শন, চিৎকার-চেঁচামেচি এবং প্রশাসনিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগ রয়েছে।
সিপিও (পূর্ব) কার্যালয়ের একাধিক কর্মচারী দাবি করেন, তাঁর আচরণ নিয়ে ইতিমধ্যে রেলওয়ের পূর্বাঞ্চল কার্যালয়ে একাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে।
বদলি, নিয়োগ ও পেনশন বাণিজ্যের অভিযোগ
দীর্ঘদিন একই প্রশাসনিক দপ্তরে থাকার কারণে লুৎফা বেগমের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় অনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ।
রেলওয়ের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর দাবি, বদলি বাণিজ্য, নিয়োগসংক্রান্ত অনিয়ম, পেনশন ফাইল এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে তাঁর প্রভাব রয়েছে।
সাময়িক বরখাস্তের ফাইল, মুক্তিযোদ্ধা কোটাসংক্রান্ত বিষয় এবং টিএলআর নিয়োগেও তাঁর প্রভাব রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন কর্মচারী।
তাঁদের অভিযোগ, বছরের পর বছর একই দপ্তরে থাকার কারণে তৈরি হওয়া যোগাযোগ ও প্রভাববলয় ব্যবহার করে প্রশাসনিক কার্যক্রমে একটি অনানুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে নিরপেক্ষ বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে লুৎফা বেগমের মুঠোফোনে কল করে না পেয়ে তার হোয়াটসঅ্যাপে কিছু প্রশ্ন রেখে বার্তা পাঠালে তিনি ব্যাঙাত্সক ইমোজি প্রয়োগ করে বিষয়টি এড়িয়ে যান।
তবে এর আগে একটি গণমাধ্যমকে তিনি জানিয়েছেন, কারা তাঁর বিরুদ্ধে এসব তথ্য দিচ্ছেন। আমি জানি কে এসব পাঠিয়েছে। আমি দুইটা লোককে টার্গেট করছি, কারণ একজনের পদোন্নতি হবে। সে চাচ্ছে এখান থেকে কোনো ক্রমেই আমাকে সরাইতে।
তিনি আরও বলেন, কোনো অশুভ শক্তিই আমাকে সরানো সম্ভব না ভাই, আল্লাহর অলৌকিক শক্তি ছাড়া। নিজের কাজের বিষয়ে তিনি দাবি করেন, তাঁর প্রশাসন তাঁকে ভালোভাবে চেনে।
তবে তাঁর এই বক্তব্যের পর রেলওয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রশ্ন তুলেছেন-একজন কর্মচারীর চাকরির নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক অবস্থান নিয়ে এমন আত্মবিশ্বাসের উৎস কোথায়?
তদন্ত হলে কী বেরিয়ে আসবে?
একই দপ্তরে ২৩ বছর অবস্থান, অস্বাভাবিক সম্পদের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয়, প্রশাসনিক প্রভাব, সহকর্মীদের সঙ্গে আচরণ নিয়ে অভিযোগ এবং সরকারি গাড়ি ব্যবহারের প্রশ্ন-সব মিলিয়ে লুৎফা বেগমকে ঘিরে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে।
রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবি, অভিযোগগুলো ব্যক্তিগত বিরোধের ফল কি না, নাকি এর পেছনে বাস্তব অনিয়ম রয়েছে-তা নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তাঁদের মতে, প্রথমেই যাচাই করা প্রয়োজন-লুৎফা বেগম কীভাবে ২৩ বছর একই দপ্তরে বহাল থাকলেন? সম্পদের সঙ্গে তাঁর বৈধ আয়ের সামঞ্জস্য আছে কি না?
