সাজ্জাদের ছায়ায় ডেভিড ইমনের উত্থান, চট্টগ্রামে সন্ত্রাসের নতুন বলয়

প্রকাশিত: ৩০ জুলাই, ২০২৬ ১৬:১১

একটি হত্যা মামলার তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ যে জালের সন্ধান পেয়েছে, তার বিস্তার কেবল একটি হত্যাকাণ্ডে থেমে নেই।

চাঁদার জন্য বিদেশি নম্বর থেকে ফোন, ব্যবসায়ীদের ভয় দেখানো, একের পর এক হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ, অস্ত্রের মজুত, সন্ত্রাসীদের সমন্বয় এবং সীমান্ত পেরিয়ে আত্মগোপনের চেষ্টা-সব মিলিয়ে চট্টগ্রামের অপরাধজগতের একটি ভয়ংকর নেটওয়ার্কের ছবি সামনে এনেছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ।

এই নেটওয়ার্কের সামনের সারিতে উঠে এসেছে মোবারক হোসেন ওরফে ইমন ওরফে ‘ডেভিড ইমনের’ নাম।

পুলিশ বলছে, মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে তিনি চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় ভয়ভীতি, চাঁদাবাজি, অস্ত্রবাজি ও হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

তাঁর বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলার বিভিন্ন থানায় অন্তত ১৫টি মামলা থাকার কথা জানিয়েছে পুলিশ। এসবের মধ্যে হত্যা, অস্ত্র ও চাঁদাবাজির মামলাও রয়েছে।

পাহাড়তলীতে মাকসুদুল হক চৌধুরী হত্যার তদন্ত করতে গিয়ে সেই ইমন ও তাঁর সহযোগীদের একটি অস্ত্রভান্ডারের সন্ধান পাওয়াকে তাই নিছক আরেকটি অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা হিসেবে দেখছে না পুলিশ।

তদন্তকারীদের কাছে এটি চট্টগ্রামের অপরাধজগতের একটি বড় নেটওয়ার্কের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র।

গত ১৩ জুন পাহাড়তলী এলাকায় মাকসুদুল হক চৌধুরী হত্যার পর ঘটনাটির তদন্তে নামে চট্টগ্রাম জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। সিসিটিভি ফুটেজ, প্রযুক্তিগত তথ্য এবং গোয়েন্দা সূত্র ধরে আসামিদের শনাক্তের চেষ্টা চলছিল।

তদন্তের একপর্যায়ে ২২ জুলাই গ্রেপ্তার হন মামলার এজাহারভুক্ত আসামি মো. মিঠু ওরফে ধামা ইলিয়াছ।

পুলিশের ভাষ্য, আদালতের অনুমতি নিয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদে চট্টগ্রামের সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক, অস্ত্রের গোপন আস্তানা এবং সহযোগীদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়।

সেই তথ্যের সূত্র ধরে যশোরে অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হয় ডেভিড ইমনসহ কয়েকজনকে। এরপর তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ফটিকছড়ির কাঞ্চননগরের একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে অভিযান চালায় ডিবি পুলিশ।ডেভিড ইমন

সেখানে পাওয়া যায় একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি দেশীয় এলজি এবং একাধিক ধারালো দেশীয় অস্ত্র।

একটি হত্যা মামলার সূত্র ধরে টিলার পাদদেশের পরিত্যক্ত বাড়িতে অস্ত্রের এই মজুতের সন্ধান পাওয়ার ঘটনাই তদন্তের গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে।

প্রশ্ন উঠেছে-এই অস্ত্রগুলো কার জন্য, কোথা থেকে এল, কার নির্দেশে জমা করা হয়েছিল এবং এর আগে কতটি অপরাধে এসব অস্ত্র ব্যবহার হয়েছে?

এসব প্রশ্নের উত্তর এখন তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ক্রিকেটের মাঠ থেকে অপরাধের অন্ধকারে

ডেভিড ইমনের গল্পের শুরুটা অবশ্য অস্ত্র দিয়ে নয়, ক্রিকেট দিয়ে। ফটিকছড়ির কাঞ্চননগরের এই তরুণ স্কুলজীবন থেকেই ক্রিকেট খেলতেন।

সাইকেলে করে স্থানীয় মাঠ থেকে ফটিকছড়ি কলেজ মাঠে অনুশীলনে যেতেন। পরে চট্টগ্রাম নগরের অক্সিজেনে আত্মীয়ের বাসায় থেকে নিয়মিত ক্রিকেট প্রশিক্ষণ নেন। খেলতেন চট্টগ্রাম ব্রাদার্স একাডেমিতে, অনুশীলন করতেন কাজীর দেউড়ি স্টেডিয়ামে।

সাবেক কোচ আমিনুল হকের ভাষ্য অনুযায়ী, বাঁহাতি লেগ স্পিনার হিসেবে ইমনের ভালো সম্ভাবনা ছিল। ব্যাটিংও করতেন ভালো। চট্টগ্রামে জাতীয় দল বা বিদেশি দল এলে নেট অনুশীলনে বল করার সুযোগও পেয়েছেন।

কিন্তু ২০২০ সালের পর ক্রিকেটের মাঠ থেকে তাঁর হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার সঙ্গে বদলে যেতে থাকে তাঁর জীবন।

পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য অনুযায়ী, এসএসসি পাস করার পর কলেজে ভর্তি হলেও এইচএসসি পরীক্ষা দেওয়া হয়নি তাঁর।

করোনার সময়ের পর তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হন বলে স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে। পরে বিদেশে যান, আবার দেশে ফেরেন। এরপর তাঁর পরিচয় আর ক্রিকেটার হিসেবে নয়-অপরাধের অভিযোগে।

৫ আগস্টের পর বদলে গেল সমীকরণ

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ইমন আত্মগোপনে চলে যান বলে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য। তখন তিনি নগরের বায়েজীদ বোস্তামী এলাকার আতুরার ডিপো এলাকায় অবস্থান করতেন।

সেখানেই তাঁর যোগাযোগ তৈরি হয় চট্টগ্রামের আলোচিত সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদের সঙ্গে।

পুলিশের দাবি, পরবর্তী সময়ে এই যোগাযোগের সূত্রেই বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের নেটওয়ার্কে ইমনের অবস্থান শক্ত হয়।

পুলিশের ভাষ্য, ৫ আগস্টের পর অক্সিজেন এলাকায় ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে ইমনের সক্রিয় অংশগ্রহণ বড় সাজ্জাদের নজরে আসে। তারপরই দ্রুত বাড়তে থাকে তাঁর প্রভাব।

পুলিশের দাবি, বর্তমানে বিদেশে পলাতক বড় সাজ্জাদের হয়ে চট্টগ্রামে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় নেতৃত্ব দেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ইমন অন্যতম। তাঁর সঙ্গে মোহাম্মদ রায়হানের নামও তদন্তে এসেছে।

এই দাবির পূর্ণ সত্যতা অবশ্য আদালতে প্রমাণের বিষয়। তবে একাধিক হত্যা, অস্ত্র ও চাঁদাবাজির মামলায় ইমনের নাম আসা এবং তাঁর কাছ থেকে অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় তদন্তের পরিধি যে বড় হয়েছে, তা স্পষ্ট।

‘বিদেশি নম্বর’ থেকে আসত আতঙ্কের ফোন

ইমনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত চাঁদাবাজির ফোন। পুলিশের দাবি, ব্যবসায়ী, প্রবাসী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিকদের বিদেশি নম্বর থেকে ফোন করে কোটি কোটি টাকা চাঁদা দাবি করতেন ইমন। কখনো এককালীন বিপুল অর্থ, কখনো মাসিক চাঁদা-দাবির ধরন ছিল এমনই।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে বায়েজীদ বোস্তামী থানা শ্রমিক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজ উদ্দিনকে ফোন করে হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

আর একটি ঘটনায় নগরের বাকলিয়া অ্যাকসেস রোডের একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের মালিকের কাছে দুই কোটি টাকা এককালীন এবং মাসে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করার অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁকে বলা হয়েছিল-ব্যবসা করতে হলে ওই অর্থ দিতে হবে; অন্যথায় ব্যবসা করতে দেওয়া হবে না।

এই অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করতে হলে শুধু ফোনকলের অভিযোগই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন কলের উৎস, নম্বরের মালিকানা, আর্থিক লেনদেন, মধ্যস্থতাকারী, সম্ভাব্য অর্থগ্রহীতা এবং চাঁদার অর্থ কোথায় গেছে-এসবের ফরেনসিক ও আর্থিক তদন্ত।

কারণ চাঁদাবাজির একটি ফোন সাধারণত একজন ব্যক্তির অপরাধ নয়; এর পেছনে থাকে তথ্য সংগ্রহ, ভয় দেখানো, অর্থ আদায় এবং অর্থ সরবরাহের একটি কাঠামো।

হত্যার মামলায় বারবার ইমনের নাম

পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়ায় জোড়া খুন, একই বছরের ২৩ মে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় ঢাকাইয়া আকবর হত্যাকাণ্ড, হাটহাজারীর জোড়া খুন এবং চান্দগাঁওয়ের আফতাব হত্যা মামলাসহ বিভিন্ন ঘটনায় ইমনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।

বাকলিয়ার জোড়া খুনের ঘটনায় মোটরসাইকেল ভাড়া করা ও সন্ত্রাসীদের সমন্বয়ের দায়িত্ব তাঁর ছিল বলেও পুলিশের দাবি। এখানেই তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে-ইমন কি কেবল মাঠপর্যায়ের একজন অস্ত্রধারী, নাকি তাঁর ভূমিকা ছিল আরও বিস্তৃত?

যদি একাধিক ঘটনায় একই ধরনের লোকবল, অস্ত্র, মোটরসাইকেল, যোগাযোগব্যবস্থা ও অর্থের উৎস পাওয়া যায়, তাহলে মামলাগুলোকে বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ কমে যায়। তখন প্রয়োজন হয় একটি সমন্বিত অপরাধ নেটওয়ার্ক হিসেবে তদন্তের।

থানার লুট হওয়া অস্ত্রের প্রশ্ন

৫ আগস্টের পর থানা থেকে লুট হওয়া ১৫ থেকে ২০টি অস্ত্র হাতে ইমনের একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে।

ছবিটির উৎস, সময় ও সত্যতা আলাদাভাবে যাচাই করা জরুরি। তবে এটি সত্য হলে তদন্তের জন্য প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুতর, লুট হওয়া অস্ত্রগুলো কোথায় গেল?

সম্প্রতি ফটিকছড়ির একটি পরিত্যক্ত বাড়ি থেকে বিদেশি পিস্তল ও দুটি দেশীয় এলজি উদ্ধারের ঘটনা সেই প্রশ্নকে আরও সামনে এনেছে।

উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের ব্যালিস্টিক পরীক্ষা, আগের কোনো মামলায় ব্যবহৃত অস্ত্রের সঙ্গে মিল এবং অস্ত্রগুলোর সম্ভাব্য উৎস শনাক্ত করা গেলে এই নেটওয়ার্কের গতিপথ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

জামিনের পর কি বদলে গিয়েছিল তাঁর অপরাধের পরিধি?

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বায়েজীদ থানার একটি দস্যুতার মামলায় কক্সবাজার থেকে ইমন গ্রেপ্তার হয়েছিলেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। কিন্তু ২২ দিনের মধ্যে জামিনে বেরিয়ে আসেন তিনি। এরপর তাঁর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড আরও বিস্তৃত হয় বলে পুলিশের দাবি।

এই জায়গাটি তদন্তের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। একজন আসামি গ্রেপ্তার হওয়ার পর কীভাবে দ্রুত জামিন পেলেন, জামিনের পর তাঁর গতিবিধি কী ছিল, কার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন, কোথায় ছিলেন এবং এরপর কোন কোন মামলায় তাঁর নাম এসেছে-এসব তথ্য পাশাপাশি রাখলে তাঁর অপরাধজগতের বিস্তারের একটি সময়রেখা তৈরি করা সম্ভব।

সীমান্তে পালানোর চেষ্টা, নাকি চলাচলের পুরোনো পথ?

ইমনের যশোরে গ্রেপ্তার হওয়াও তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

চট্টগ্রাম রেঞ্জ পুলিশের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইমন গ্রেপ্তারের কয়েক দিন আগে যশোর সীমান্ত দিয়ে দেশে ঢুকেছিলেন। পুলিশের অভিযানের খবর পেয়ে আবার ভারতে পালানোর চেষ্টা করার সময় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পুলিশের কাছে তাঁর দুটি দেশি-বিদেশি পাসপোর্ট থাকার তথ্যও রয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

এখন তদন্তকারীদের সামনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন-সীমান্তপথ কি শুধু আত্মগোপনের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে, নাকি অপরাধী নেটওয়ার্কের যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও এর সম্পর্ক আছে?

ইমনের বিদেশযাত্রার নথি, পাসপোর্ট, ইমিগ্রেশন রেকর্ড, সীমান্তে চলাচল, বিদেশি নম্বর থেকে ফোন এবং সম্ভাব্য আর্থিক লেনদেন একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা হলে সেই প্রশ্নের উত্তর মিলতে পারে।

‘বড়লোক হওয়ার জন্য এই পথে’

সন্ত্রাসের পথে কেন গেলেন-এমন প্রশ্নের জবাবে ইমন নিজেই বলেছেন, ছোটবেলা থেকে তাঁর ইচ্ছা ছিল বড় ক্রিকেটার হওয়া, না হলে বড়লোক হওয়া; বড়লোক হওয়ার জন্য তিনি এই পথে আছেন।

এই বক্তব্যের মধ্যেই হয়তো তাঁর অপরাধজগতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্রটি লুকিয়ে আছে-অর্থ।

কোটি কোটি টাকার চাঁদার দাবি, ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা, অস্ত্র, সন্ত্রাসী দল পরিচালনা-এসবের শেষ গন্তব্য যদি অর্থ হয়, তাহলে শুধু অস্ত্র উদ্ধার করে তদন্ত শেষ করলে নেটওয়ার্কের মূল শিকড় অক্ষত থেকে যেতে পারে।

কারা টাকা দিত? কারা টাকা তুলত? টাকা কোথায় জমা হতো? কারা তা ভাগ করে নিত? অস্ত্র কেনার অর্থ কোথা থেকে আসত? বিদেশি নম্বরের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে ছিল? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রয়োজন আর্থিক গোয়েন্দা তদন্তও।

টিলার অস্ত্রভান্ডার আসলে কত বড় নেটওয়ার্কের দরজা?

ফটিকছড়ির কাঞ্চননগরের মানিকপুর গ্রামের পাইট্রাল টিলাপাড়ার পরিত্যক্ত বাড়িতে পাওয়া অস্ত্র হয়তো এই তদন্তের শেষ নয়, বরং শুরু।

কারণ একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে অস্ত্র রাখার অর্থ হলো অস্ত্র সংরক্ষণের জন্য নিরাপদ স্থান, সেখানে যাতায়াতের লোক, অস্ত্রের মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজনে অস্ত্র সরবরাহের একটি ব্যবস্থা থাকার সম্ভাবনা।

এই ব্যবস্থার সঙ্গে কারা যুক্ত-সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

মাকসুদুল হক চৌধুরী হত্যার তদন্ত যদি সেই নেটওয়ার্কের আরও গভীরে পৌঁছাতে পারে, তাহলে বেরিয়ে আসতে পারে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত একাধিক অপরাধের মধ্যে থাকা যোগসূত্র।

শুধু ইমন নয়, সামনে আসতে হবে পুরো নেটওয়ার্ক

ডেভিড ইমন গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাঁর কয়েকজন সহযোগীও গ্রেপ্তার হয়েছেন। অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। কিন্তু তদন্ত এখানেই থেমে গেলে মূল প্রশ্নগুলোর অনেকটাই অমীমাংসিত থেকে যাবে।

পুলিশ নিজেই বলছে, এই চক্রের পেছনে ইন্ধনদাতা, অর্থের জোগানদাতা এবং অন্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। সুতরাং এখন তদন্তের আসল পরীক্ষা হলো-মাঠের অস্ত্রধারীদের বাইরে গিয়ে নির্দেশদাতা ও অর্থদাতাদের পর্যন্ত পৌঁছানো।

চট্টগ্রামের অপরাধজগতে কোনো সন্ত্রাসী একা সাম্রাজ্য গড়ে তোলে না। তার প্রয়োজন হয় আশ্রয়, অর্থ, অস্ত্র, তথ্য, যোগাযোগ, পরিবহন এবং আইনগত ঝুঁকি সামলানোর লোকজন। এই স্তরগুলো শনাক্ত না হলে একজন ইমন ধরা পড়লেও আরেকজন ইমনের জন্য জায়গা তৈরি হতে পারে।

পাহাড়তলীর একটি হত্যাকাণ্ডের সূত্র ধরে ফটিকছড়ির টিলায় অস্ত্রভান্ডার পাওয়া গেছে। সেই সূত্র যদি সত্যিই চট্টগ্রামের সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের গভীরে পৌঁছে থাকে, তাহলে এই তদন্তের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু পাঁচজন আসামিকে গ্রেপ্তার করা নয়-পুরো নেটওয়ার্কের অর্থ, অস্ত্র, নির্দেশনা ও যোগাযোগের কাঠামো উন্মোচন করা।

কারণ একটি পিস্তল উদ্ধার করা যায়। একটি আস্তানা ভেঙে দেওয়া যায়। একজন সন্ত্রাসীকেও গ্রেপ্তার করা যায়। কিন্তু সন্ত্রাসের অর্থের উৎস, অস্ত্রের সরবরাহ এবং নির্দেশদাতাদের অদৃশ্য নেটওয়ার্ক অক্ষত থাকলে-ত্রাসের রাজত্বের শেষ হয় না।