চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির ঐতিহাসিক আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া বাবুনগর মাদ্রাসায় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের শীর্ষ আলেমদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
রোববার (৯ আগস্ট) বিকেল ৪টায় মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে শুরু হওয়া এ সভায় দেশের শীর্ষ পর্যায়ের প্রায় ৭০ জন বিশিষ্ট আলেমেদ্বীন অংশ নেন।
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সভাপতিত্বে আয়োজিত এ মতবিনিময় সভায় ধর্মীয় ও জাতীয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর চট্টগ্রাম সফরসূচির অংশ হিসেবেই এ সভার আয়োজন করা হয়।
সভায় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল, উত্তর চট্টগ্রামের সংসদ সদস্যসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এর আগে বিকেল সোয়া ৪টার দিকে হেলিকপ্টারে করে ফটিকছড়ির পেলাগাজী দিঘির মাঠে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। পরে সড়কপথে তিনি বাবুনগর মাদ্রাসায় যান।
সেখানে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগুরীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও একান্ত বৈঠকে অংশ নেন।
প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন জানান, হেফাজতে ইসলামের আমিরের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে প্রধানমন্ত্রী তাঁর স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নেন।
একান্ত বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল, ফটিকছড়ির সংসদ সদস্য সরওয়ার আলমগীর এবং হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা সাজিদুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রীর কাছে হেফাজতের নয় দফা দাবি
আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগুরীর সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক এবং পরবর্তী মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে নয় দফা দাবি তুলে ধরে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ।
দাবিগুলোর মধ্যে ইসলাম ধর্ম ও ধর্মীয় অনুভূতির সুরক্ষা, কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ, বিভিন্ন ঘটনার বিচার এবং ধর্মীয় বিষয়ে সরকারের নীতিগত পদক্ষেপের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
হেফাজতে ইসলামের নয় দফা দাবি হলো-
১. মহান আল্লাহ, রাসূল (সা.), পবিত্র কুরআন ও ইসলাম ধর্মের অবমাননা রোধে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রেখে আইন প্রণয়ন।
২. কুরআন-সুন্নাহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো আইন পাস না করা।
৩. ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে সংঘটিত কথিত গণহত্যা, ২০২১ সালের মোদিবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচার নিশ্চিত করা।
৪. দাওরায়ে হাদিসের মাস্টার্স সমমানের স্বীকৃতি কার্যকর করে কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ করা। পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগে দাওরায়ে হাদিসকে শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা।
৫. প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য ইসলাম ধর্ম শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা।
৬. হেফাজতের ভাষায়, কাদিয়ানি সম্প্রদায়কে অমুসলিম ঘোষণা এবং হিজবুত তাওহিদকে নিষিদ্ধ করা।
৭. পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে দেশি-বিদেশি মিশনারিদের কথিত ষড়যন্ত্র ও অপতৎপরতা বন্ধ করা।
৮. আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আলেমদের বিরুদ্ধে দায়ের করা কথিত মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করে আলেম-ওলামাকে রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠনে অংশীদার করা।
৯. তাবলিগ জামাতের কার্যক্রম ও টঙ্গী বিশ্ব ইজতেমা ওলামায়ে কেরামের তত্ত্বাবধানে পরিচালনা করা, মাওলানা সাদ কান্ধলভীর বাংলাদেশে প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা এবং টঙ্গী ময়দানে সাদপন্থীদের ইজতেমার অনুমতি না দেওয়া।
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের উত্থাপিত দাবিগুলো সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেন, হেফাজতের অনেক দাবিই সরকারেরও বিবেচনার বিষয়। সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে।
এরপর মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে স্থানীয় আলেম-ওলামা এবং হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা বিভিন্ন বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরে ফটিকছড়িতে উৎসবমুখর পরিবেশ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আগমনকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই ফটিকছড়ির বিভিন্ন এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
হেলিপ্যাড থেকে বাবুনগর মাদ্রাসা পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে বিপুলসংখ্যক মানুষ ও মাদ্রাসাশিক্ষার্থী অবস্থান নেন।
এর আগে বাঁশখালী থেকে হেলিকপ্টারে ফটিকছড়ির পেলাগাজী দিঘির মাঠে অবতরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। সেখান থেকে সড়কপথে বাবুনগর মাদ্রাসায় পৌঁছান তিনি।
ঐতিহাসিক এ মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে হেফাজতে ইসলামের শীর্ষ আলেমদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর এ মতবিনিময়কে ঘিরে দিনভর ফটিকছড়িতে ছিল ব্যাপক আগ্রহ ও উৎসাহ।
একান্ত বৈঠক থেকে শুরু করে প্রায় ৭০ জন আলেমের অংশগ্রহণে মতবিনিময় সভা-সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বাবুনগর সফর চট্টগ্রামের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অঙ্গনে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
