একদিকে র্যাবের তালিকায় আসামির নাম, পুলিশের চার্জশিট এবং আদালতের নির্দেশে দীর্ঘ দুই মাসের কারাবাস। অন্যদিকে একই সময়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) নথিপত্রে উপস্থিত থেকে নিয়মিত বেতন উত্তোলন ও পদোন্নতি।
আইনের চোখ বেঁধে এমন অবিশ্বাস্য ভেল্কিবাজির মাধ্যমে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে রাজত্ব চালিয়ে যাচ্ছেন মো. আলমগীর খান।
সংস্থাটির সাবেক এস্টেট অফিসার ও বর্তমানে সহকারী সচিব পদে কর্মরত এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধের সুস্পষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও চউক প্রশাসনের এই নীরব ভূমিকা যেন এক চরম প্রশাসনিক দুর্নীতির সাক্ষী হয়ে রয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত ২০১১ সালের এক উত্তাল দিনে। নগরের ব্যস্ততম স্টেশন রোড এলাকা থেকে একটি বিদেশি পিস্তল ও ৯ রাউন্ড তাজা গুলিসহ ‘চট্ট মেট্রো গ-১২-২২৬১’ নম্বরের একটি লাক্সারি গাড়ি জব্দ করে এলিট ফোর্স র্যাব।
অনুসন্ধানে জানা যায়, র্যাবের অভিযানের মুখে সশস্ত্র চক্রটি গাড়ি ফেলে পালিয়ে গেলেও গাড়িটির মালিকানা ছিল তৎকালীন সিডিএ কর্মকর্তা আলমগীর খানের।
ওই ঘটনায় কোতোয়ালী থানায় ১৮৭৮ সালের অস্ত্র আইনের ১৯(এ) ধারায় মামলা দায়ের হয়। তদন্ত শেষে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা তাকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করে, যা ২০১২ সালে আদালত কর্তৃক গৃহীত হয়।
তবে সবচেয়ে বড় ভেল্কিবাজি ঘটে এর পরেই। একদিকে পুলিশ খাতায় তাকে পলাতক দেখিয়ে গ্রেফতারের চেষ্টা চালানোর দাবি করতে থাকে, অন্যদিকে আলমগীর খান নিয়মিত সিডিএ’র দাপ্তরিক চেয়ারে বসে নথি সই করেছেন এবং সরকারি কোষাগার থেকে বেতন-ভাতা গুনে নিয়েছেন।
পরবর্তীতে ২০১২ সালের মাঝামাঝি সময়ে আদালতে আত্মসমর্পণ করলে বিচারক তার জামিন নামঞ্জুর করে জেলা কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। টানা দুই মাসেরও বেশি সময় তিনি কারাভোগ করেন।
রাষ্ট্রীয় ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের চাকরিবিধি অনুযায়ী, ফৌজদারি অপরাধে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী গ্রেফতার কিংবা কারাবরণ করলে তাকে অবিলম্বে সাময়িক বরখাস্ত (Suspension) করার সুস্পষ্ট বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
কিন্তু আলমগীর খানের ক্ষেত্রে সেই নিয়মকে স্রেফ বুড়ো আঙুল দেখানো হয়েছে। সিডিএ প্রশাসন না তাকে বরখাস্ত করেছে, না তার বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় শোকজ জারি করেছে।
উল্টো রহস্যজনক এক অদৃশ্য বলয়ের সহায়তায় ১১তম গ্রেড থেকে সরাসরি ৯ম গ্রেডের কর্মকর্তা হিসেবে তাকে পদোন্নতির পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনিক এই বিশৃঙ্খলা ও তোষণনীতি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ মানবাধিকার পরিষদের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান এডভোকেট সেলিম চৌধুরী।
তিনি স্পষ্ট জানান, ফৌজিদারী মামলায় সাজা বা বিচার চলাকালীন কোনো সরকারি কর্মকর্তা পদে বহাল থাকা তো দূরের কথা, কোনো ধরনের সুবিধা বা প্রমোশন পেতে পারেন না। এটি আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের এক ভয়াবহ নজির।
সিডিএ’র ভেতরের বিশৃঙ্খলা কতটা গভীরে পৌঁছেছে, তা উঠে এসেছে সংস্থাটির সিবিএ সভাপতি ফয়েজ আহম্মদের বক্তব্যে।
তিনি জানান, বিগত সরকারের আমলে ক্ষমতার অপব্যবহার করে একটি প্রভাবশালী মহল ঘটনাটি চেপে রেখেছিল। ঊর্ধ্বতন মহলের কাছে তথ্য গোপন করে এই অনিয়মকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে। এমনকি বর্তমানে এ সংক্রান্ত কোনো ফাইল বা নথি দফতরে অবশিষ্ট আছে কি না, তা নিয়েও আমরা মারাত্মক সংশয়ে আছি।
একজন অস্ত্র মামলার আসামি কীভাবে এক যুগ ধরে আড়ালে থেকে প্রশাসনিক সুবিধা ভোগ করে রাজত্ব করে গেলেন-তা নিয়ে এখন পুরো চট্টগ্রামে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে চলা এই ভেল্কিবাজির বিষয়ে বক্তব্য জানতে আলমগীর খানের ব্যক্তিগত মুঠোফোনে একাধিকবার কল এবং খুদে বার্তা (এসএমএস) পাঠানো হলেও তিনি নিজেকে আড়াল করতেই পছন্দ করেছেন।
তবে প্রশাসনিক ব্যবস্থার জট খোলার আশ্বাস দিয়েছে চউক-এর বর্তমান শীর্ষ পরিচালনা পর্ষদ।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) অর্থ ও প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত সার্বক্ষণিক সদস্য (অতিরিক্ত সচিব) নুরুল্লাহ নূরী এ বিষয়ে বলেন, বিষয়টি আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। এর পেছনে কোনো আইনগত ফাঁকফোকর কিংবা প্রশাসনিক গাফিলতি রয়েছে কি না, তা গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত করে দ্রুতই আইনানুগ ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে দীর্ঘ ১২ বছর ধরে গড়ে তোলা আলমগীর খানের এই ‘অদৃশ্য রাজত্ব’ ভেঙে তাকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে, নাকি প্রশাসনিক উদাসীনতায় এটিও হারিয়ে যাবে-সেদিকেই এখন নজর সচেতন মহলের।
