সিডিএর নিয়োগে অদ্ভুত কাণ্ড: যোগ্যতা না থাকলেও পরীক্ষা, নিয়োগ-পদায়ন

প্রকাশিত: ১০ আগস্ট, ২০২৬ ২৩:৪৬

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) ইমারত পরিদর্শক নিয়োগে প্রশ্ন এখন শুধু আটজনের যোগ্যতা নিয়ে নয়, প্রশ্ন উঠেছে পুরো নিয়োগপ্রক্রিয়ার তদারকি ও জবাবদিহি নিয়েও।

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে যে শিক্ষাগত যোগ্যতা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা ছিল, সেটি পূরণ না করেও কীভাবে কয়েকজন প্রার্থী আবেদন থেকে শুরু করে লিখিত পরীক্ষা, মৌখিক পরীক্ষা, চূড়ান্ত নির্বাচন, নিয়োগ ও পদায়নের ধাপ পেরিয়ে গেলেন-এখন সেই প্রশ্নই সামনে।

চাকরিতে যোগদানের প্রায় পাঁচ মাস পর সিডিএর যাচাই-বাছাইয়ে ধরা পড়েছে, আট ইমারত পরিদর্শকের নির্ধারিত শিক্ষাগত যোগ্যতা নেই। তাঁদের কারও যোগদানপত্রও গ্রহণ করা হয়নি। শেষ পর্যন্ত চাকরিই হারাতে হয়েছে তাঁদের।

গত ৬ আগস্ট সিডিএর সচিব মাহবুব উল করিম স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে আটজনকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।

আদেশে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ২১ অক্টোবর প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি এবং ২০২৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি দেওয়া নিয়োগপত্রের শর্ত অনুযায়ী তাঁদের যথাযথ শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল না।

অব্যাহতি পাওয়া আটজন হলেন-অনয় সিংহ সুজাত (রোল ২০০১২৫), দ্বিন ইসলাম লিমন (২০০১৩২), মো. আবদুর রহমান রিয়াদ (২০০১২৭), তাহমিদুল ইসলাম ইবনুল (২০০২৬২), মো. মাহিদুল হাসান (২০০২২৪), মো. ইকরামুল হক (২০০২৫৬), ইজতিহাদ ইসলাম খান (২০০১৭১) ও মো. শরিফুল ইসলাম (২০০১৬৮)।

বিজ্ঞপ্তির শর্ত ছিল এক, নিয়োগে প্রশ্ন উঠল অন্য জায়গায়

সিডিএ সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ইমারত পরিদর্শক পদে আবেদনের জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারিত ছিল উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) বা সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া এবং স্বীকৃত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সার্ভে ফাইনাল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া। সংশ্লিষ্ট কাজে অভিজ্ঞতা থাকলে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও ছিল।

কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, নির্ধারিত শিক্ষাগত যোগ্যতা পূরণ না করা, বিশেষ করে এসএসসি পাস-প্রার্থীরাও এই পদে নিয়োগের সুযোগ পেয়েছেন।

সেখানেই প্রশ্নটি আরও গুরুতর হয়ে ওঠে। কারণ বিষয়টি কেবল নিয়োগের চূড়ান্ত পর্যায়ে আটকে ছিল না। যোগ্যতা যাচাইয়ের একাধিক সুযোগ পেরিয়ে প্রার্থীরা লিখিত পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন, মৌখিক পরীক্ষা দিয়েছেন, চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পেয়েছেন এবং নিয়োগপত্রও পেয়েছেন। অর্থাৎ, নিয়োগের প্রতিটি ধাপেই তাঁদের যোগ্যতা যাচাইয়ের সুযোগ ছিল।

তারপরও কেন প্রায় পাঁচ মাস পর বিষয়টি সামনে এল-এটাই এখন সিডিএর নিয়োগ ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি।

১৮টি পদ, পরীক্ষা থেকে নিয়োগ-তারপর বাদ আট

২০২৫ সালের ২১ অক্টোবর প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির ১৭ নম্বর কলামে ১৮ জন ইমারত পরিদর্শক নিয়োগের কথা বলা হয়। প্রার্থীদের সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩২ বছর।

এরপর ২০২৬ সালের ১৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় লিখিত পরীক্ষা। ২৫ জানুয়ারি মৌখিক পরীক্ষা শেষে সেদিনই নির্বাচিত প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হয়।

১৫ ফেব্রুয়ারি তাঁদের নিয়োগপত্র দেওয়া হয়। ২২ ফেব্রুয়ারি তাঁরা চাকরিতে যোগ দেন। পরে ৯ মার্চ তাঁদের অথরাইজেশন শাখায় পদায়ন করা হয়।

কিন্তু নিয়োগপ্রক্রিয়ার এই দীর্ঘ পথ পেরিয়ে প্রায় পাঁচ মাস দায়িত্ব পালনের পর তাঁদের আটজনের যোগ্যতা নিয়ে আপত্তি ওঠে।

আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, সূত্রের দাবি, এই আটজনের কেউই ওই সময়ে বেতন পাননি।

অর্থাৎ, তাঁরা নিয়োগপত্র পেয়েছেন, চাকরিতে যোগ দিয়েছেন, পদায়নও হয়েছে-কিন্তু বেতন পাওয়ার আগেই তাঁদের চাকরি নিয়ে প্রশ্ন চূড়ান্ত পরিণতিতে পৌঁছেছে।

সিদ্ধান্ত হয়েছিল ২ এপ্রিল, আদেশ এলো ৬ আগস্ট

আটজনের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর বিষয়টি সিডিএর বোর্ডসভায় যায়। গত ২ এপ্রিল অনুষ্ঠিত সভায় তাঁদের অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয় বলে জানা গেছে।

কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরও তা সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর হয়নি। প্রায় চার মাস পর, গত ৬ আগস্ট অফিস আদেশ জারি করে তাঁদের চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

এই বিলম্বও এখন আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগ, বোর্ডের সিদ্ধান্তের পর একটি মহল মন্ত্রণালয়ে তদবির করে নিয়োগ বহাল রাখার চেষ্টা করেছিল।

তবে এ অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে তদবিরের বিষয়টি অভিযোগ হিসেবেই বিবেচিত হওয়া প্রয়োজন এবং এ বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি।

যে নিয়োগ শুরু থেকেই প্রশ্নের মুখে

এই নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিটি শুরু থেকেই নানা অভিযোগের মুখে পড়ে। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আগেই ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ ওঠে।

পরে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগও সামনে আসে। এমনকি প্রয়োজনীয় যোগ্যতা না থাকা প্রার্থীদের পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল-এমন অভিযোগও করা হয়।

এসব অভিযোগের পর আদালতের নিষেধাজ্ঞা, একাধিক লিখিত অভিযোগ এবং মন্ত্রণালয়ের তদন্তের বিষয় সামনে আসে।

মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল বলেও জানা গেছে। কিন্তু এসব কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশ্যে না আসায় নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্নের পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়নি।

বরং বর্তমান সরকার ও সিডিএর চেয়ারম্যান পরিবর্তনের পর পুরোনো বিষয়টি নতুন করে সামনে আসে।

এরপর ২ এপ্রিলের বোর্ডসভায় যখন কয়েকজনের নির্ধারিত শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকার বিষয়টি স্পষ্ট হয়, তখন তাঁদের অব্যাহতির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

প্রশ্নটা এখন আটজনকে ছাড়িয়ে গেছে

আটজনকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়ার মধ্য দিয়ে তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক সিদ্ধান্তটি হয়তো কার্যকর হয়েছে। কিন্তু এতে মূল প্রশ্নগুলোর উত্তর মেলে না।

প্রথম প্রশ্ন-নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে এইচএসসি বা সমমানের শিক্ষাগত যোগ্যতা বাধ্যতামূলক থাকলে তা যাচাই না করেই সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের আবেদন কীভাবে গ্রহণ করা হলো?

দ্বিতীয় প্রশ্ন-আবেদন গ্রহণের পর লিখিত পরীক্ষার আগে প্রাথমিক বাছাইয়ে বিষয়টি ধরা পড়ল না কেন?

তৃতীয় প্রশ্ন-লিখিত পরীক্ষা পেরিয়ে মৌখিক পরীক্ষায় যাওয়ার সময়ও যদি যোগ্যতা যাচাই করা হয়ে থাকে, তাহলে অযোগ্যতার বিষয়টি তখন শনাক্ত হলো না কেন?

চতুর্থ প্রশ্ন-মৌখিক পরীক্ষার পর চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের সময়ও কি নথিপত্র যাচাই করা হয়নি?

পঞ্চম প্রশ্ন-১৫ ফেব্রুয়ারি নিয়োগপত্র দেওয়ার আগে সিডিএ কি প্রার্থীদের মূল সনদ ও শিক্ষাগত যোগ্যতা যাচাই করেছিল?

আর যদি যাচাই না করেই নিয়োগ দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে সরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের নিয়োগপ্রক্রিয়ায় এতগুলো স্তরে যাচাই ব্যবস্থা থাকার অর্থ কী?

এই নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর সিডিএর অর্থ ও প্রশাসন সদস্য (অতিরিক্ত সচিব) নুরুল্লাহ নুরী বলেছিলেন, কোনো প্রার্থীর চাহিত যোগ্যতা না থাকলে পরীক্ষায় অংশগ্রহণেরই সুযোগ নেই।

এরপরও যদি কম যোগ্যতাসম্পন্ন কারও নিয়োগ হয়ে থাকে, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখে যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনে নিয়োগ বাতিল ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছিলেন তিনি।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই বক্তব্যের সঙ্গেই যেন নতুন করে প্রশ্নটি ফিরে এসেছে-যদি যোগ্যতা না থাকা অবস্থায় পরীক্ষায় অংশ নেওয়ারই সুযোগ না থাকার কথা, তাহলে আটজন প্রার্থী লিখিত পরীক্ষা থেকে নিয়োগপত্র পর্যন্ত কীভাবে পৌঁছালেন?

নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্কের সময় তৎকালীন চেয়ারম্যান প্রকৌশলী নুরুল করিম প্রক্রিয়াটিকে শতভাগ স্বচ্ছ বলে দাবি করেছিলেন।

কিন্তু এখন আটজনের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে কর্তৃপক্ষের নিজস্ব যাচাইয়ের পর অব্যাহতির সিদ্ধান্ত সেই স্বচ্ছতার দাবিকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।

এখানে কোনো ব্যক্তি বা কর্মকর্তাকে দায়ী করার আগে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। কারণ শুধু আটজনের নিয়োগ বাতিল করলেই প্রশ্নের সমাধান হবে না।

বরং তাঁদের আবেদন গ্রহণ থেকে শুরু করে নথি যাচাই, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার অনুমোদন, চূড়ান্ত তালিকা প্রণয়ন, নিয়োগপত্র ইস্যু এবং যোগদানের অনুমোদন-প্রতিটি ধাপ খতিয়ে দেখা দরকার।

কার দায়িত্বে কোন পর্যায়ে যাচাই হওয়ার কথা ছিল, কোথায় তা ব্যর্থ হয়েছে, কোনো কর্মকর্তা বা কমিটি দায়িত্বে অবহেলা করেছে কি না, এবং অভিযোগ করা অনিয়মের সঙ্গে কারও সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না-এসব প্রশ্নের উত্তর বের না হলে একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি থেকেই যাবে।

প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ তদন্ত

সিডিএর এই ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-অযোগ্য আটজনকে শেষ পর্যন্ত শনাক্ত করা গেছে, কিন্তু তাঁদের অযোগ্যতা শনাক্ত হতে এত সময় লাগল কেন, তার জবাব এখনো স্পষ্ট নয়।

একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের নিয়োগপ্রক্রিয়ায় একজন প্রার্থীর যোগ্যতা যাচাইয়ের দায়িত্ব শুধু প্রার্থীর নয়, নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষেরও।

বিশেষ করে যেখানে বিজ্ঞপ্তিতে শিক্ষাগত যোগ্যতা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে, সেখানে নিয়োগের আগে সেই যোগ্যতা যাচাই করা প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মৌলিক অংশ।

তাই আটজনের চাকরি বাতিলের পর তদন্তের পরিধি আরও বিস্তৃত হওয়া প্রয়োজন।

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি থেকে শুরু করে চূড়ান্ত নিয়োগ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ার নথি প্রকাশ্য যাচাইয়ের আওতায় এনে একটি স্বাধীন তদন্ত হলে তবেই বোঝা যাবে-এটি নিছক প্রশাসনিক ভুল, নাকি এর পেছনে ছিল আরও গুরুতর কোনো অনিয়ম।

কারণ পাঁচ মাস পর আটজনের অযোগ্যতা শনাক্ত হওয়ায় প্রশ্ন তুলছে-সিডিএর নিয়োগব্যবস্থায় যোগ্যতা যাচাইয়ের যে প্রক্রিয়া থাকার কথা, সেটি আসলে কোথায় ছিল?