‘একতারা ও রবীন্দ্রবীণা’: মাটির সুর আর মরমী আলোর মহামিলন

প্রকাশিত: ২২ আগস্ট, ২০২৬ ১৩:০০

“আমার সুরের নদী পার হয়ে যায় রূপের চরে,

তুমি সেইখানে ওই একতারাটি বাজাও বসে…”

শরতের স্নিগ্ধ সন্ধ্যায় থিয়েটার ইনস্টিটিউট চট্টগ্রামের প্রাঙ্গণে জমে উঠেছিল এক অপূর্ব সুরকাব্য। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মহাপ্রয়াণ দিবস ২২শে শ্রাবণ স্মরণে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী চট্টগ্রাম জেলা সংসদ আয়োজন করে অনন্য সাংস্কৃতিক নিবেদন—“একতারা ও রবীন্দ্রবীণা”

বাউল সুর ও রবীন্দ্রচেতনার আলো:

বাউল সাধনার সহজিয়া সুর আর রবীন্দ্রগীতির মননশীল দীপশিখা—এই দুইয়ের মহামিলনে চট্টগ্রাম শহর যেন একমুহূর্তের জন্য খুঁজে পেয়েছিল তার আত্মিক শান্তিনিকেতন। কবিগুরুর মরমী দর্শনের মূল কথাই ছিল মানুষের অন্তরে থাকা ‘মনের মানুষ’-এর সন্ধান। মাটির একতারা আর কবির রবীন্দ্রবীণা হাত ধরাধরি করে গেয়ে উঠল সেই একই অবিনাশী গান—মানবতা, সংহতি ও অসাম্প্রদায়িকতার গান।

গুণীজনদের শ্রদ্ধার্ঘ্য ও চিন্তার আলো:

উদীচী চট্টগ্রাম জেলা সংসদের সভাপতি জসীম চৌধুরী সবুজের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট অসীম বিকাশ দাশের প্রাণবন্ত সঞ্চালনায় আলোচনা সভাটি রূপ নেয় এক গভীর ভাবনার জলসায়।

অধ্যাপক সুধীর বিকাশ দেব: “রবীন্দ্রনাথের বাউল দর্শনের মূলে ছিল জাত-পাত ও গোঁড়ামির ঊর্ধ্বে মানুষের প্রতি অপরিসীম প্রেম। লালন ও গগন হরকরার সুর কবিকে বানিয়েছিল এক ‘রবীন্দ্র-বাউল’। মন্দিরের ইট-পাথরে নয়, ঈশ্বর বাস করেন মানবের গভীরে—এই প্রগতিশীল সত্যই বাউল ও রবীন্দ্রচেতনার সেতু।”

নাট্যকার অভীক ওসমান: “রবীন্দ্রনাথ আমাদের প্রতিদিনের নিঃশ্বাসে, বাঙালির জাতীয় সত্তার কেন্দ্রবিন্দুতে। উদীচীর এই পথচলা যেন সাংস্কৃতিক জগতের এক অবিনাশী অগ্নিমশাল।”

অধ্যাপক ড. শেখ সাদী: “বাঙালি জীবনে রবীন্দ্রনাথ প্রতিদিনের ভোর। তিনি আমাদের বেঁচে থাকার দীক্ষা দেন এবং শাণিত করেন শিল্পের নান্দনিক বোধকে।”

জসীম চৌধুরী সবুজ: “সংস্কৃতি কোনো অতীতচারিতা নয়, এ হলো বিভেদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের শক্তি। শোষণ ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে উদীচীর এই গানের লড়াই অব্যাহত থাকবে।”

সুর, নৃত্য ও একতারার আকুলতা:

আলোচনার পর প্রদীপ শিখার মতো জ্বলে ওঠে সাংস্কৃতিক পর্ব। বোয়ালখালী থানা সংসদের সমবেত সংগীত আর মাধবী নৃত্যকলা একাডেমির মনোমুগ্ধকর পরিবেশনা দর্শককে নিয়ে যায় এক অন্য ভুবনে। শিল্পী বৃন্তা দাশের একক নৃত্য যেন শরতের শিউলি হয়ে ঝরে পড়ল মঞ্চে।

অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ ছিল অপর্ণা চৌধুরীর সংগীত পরিচালনায় উদীচীর শিল্পীদের সুর-আলেখ্য—‘একতারা ও রবীন্দ্রবীণা’। মাটির সুর আর বিশ্বকবির গীতিসুধার এই মেলবন্ধন থিয়েটার ইনস্টিটিউটের প্রতি কোণে তৈরি করেছিল এক আবেশময় মূর্ছনা। সবশেষে, জাতীয় সংগ্রাম ও ঐক্যের প্রতীক উদীচীর সংগঠন সংগীতের মাধ্যমে পর্দা নামে এই বর্ণাঢ্য সন্ধ্যার।

মাটির একতারা আর সুরের বীণা আমাদের ফের মনে করিয়ে দিয়ে গেল—“হৃদয় আমার প্রকাশ হলো অনন্ত আকাশে…”