চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) সাবেক কমিশনার ও বর্তমানে এপিবিএন প্রধান হাসিব আজিজকে ‘হানিট্র্যাপ’ এ ফেলার ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর এবার পাঁচলাইশ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাহেদুল ইসলামকে বদলি করা হয়েছে।
একই সঙ্গে সিএমপির আরও কয়েকটি থানায় ওসি পদে রদবদল করা হয়েছে।
রোববার (২৩ আগস্ট) সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলীর সই করা এক অফিস আদেশে মো. জাহেদুল ইসলামকে সিটি এসবিতে বদলি করা হয়।
তার স্থলে পাঁচলাইশ থানার নতুন ওসি হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে খুলশী থানার ওসি মোজাম্মেল হককে।
একই আদেশে কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের পুলিশ পরিদর্শক নুর আহমদকে কর্ণফুলী থানার ওসি করা হয়েছে। কর্ণফুলী থানার বর্তমান ওসি মো. ইখতিয়ার উদ্দিনকে বদলি করা হয়েছে বায়েজিদ বোস্তামি থানায়।
অন্যদিকে সিটিএসবির মোহাম্মদ আবদুর রহিমকে খুলশী থানার নতুন ওসি করা হয়েছে।
ডিবি বন্দর জোনের পুলিশ পরিদর্শক মো. জয়নাল আবেদীন মন্ডলকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে হালিশহর থানার ওসি হিসেবে। আর সিটি এসবির মোহাম্মদ একরাম উল্লাহকে সদরঘাট থানার ওসির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
তবে এই রদবদলের আড়ালে যে অভিযোগটি সামনে এসেছে, সেটিই এখন চট্টগ্রাম পুলিশে সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ভিডিও ব্ল্যাকমেইল করে বদলি-পদায়নের অভিযোগ
তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সিএমপির সাবেক কমিশনার হাসিব আজিজের ব্যক্তিগত ভিডিও ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে সিএমপির বিভিন্ন থানায় পদায়ন ও বদলিতে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ নেতা জুবায়েরুল হক জিয়ান এবং সিএমপির দুই ওসি-বাবুল আজাদ ও জাহেদুল ইসলামের বিরুদ্ধে।
বাবুল আজাদকে এরই মধ্যে ওসি পদ থেকে সরিয়ে মহানগর গোয়েন্দা বিভাগে বদলি করা হয়েছিল।
তদন্তে উঠে আসা তথ্য বলছে, কোনো থানায় কাকে ওসি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হবে কিংবা কাকে সরিয়ে দেওয়া হবে-এমন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ঘিরে একটি চক্র প্রভাব বিস্তার করত বলে অভিযোগ রয়েছে।
পদায়ন ও বদলির দেনদরবার চূড়ান্ত হওয়ার পর জিয়ানকে দিয়ে সাবেক কমিশনার হাসিব আজিজের কাছে ফোন করানো হতো এবং কাঙ্ক্ষিত অফিস আদেশ আদায়ের চেষ্টা করা হতো বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ, অভিযোগের কেন্দ্রে ছিল শুধু ব্যক্তিগত প্রতারণা নয়, বরং সেই প্রতারণাকে ব্যবহার করে পুলিশ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারের একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া।
দেড় বছরের ‘অশুভ ট্রাইঅ্যাঙ্গেল’?
তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পাহাড়তলী থানার তৎকালীন ওসি বাবুল আজাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় জুবায়েরুল হক জিয়ানের। পরে বাবুলের মাধ্যমে তার ব্যাচমেট ও পাঁচলাইশ থানার বর্তমান ওসি জাহেদুল ইসলামের সঙ্গে সমন্বয় গড়ে ওঠে।
এই সম্পর্ককেই তদন্ত প্রতিবেদনে একটি ‘অশুভ ট্রাইঅ্যাঙ্গেল’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, এই ত্রিমুখী যোগাযোগের অন্যতম কৌশল ছিল ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার।
চট্টগ্রামের মডেল সানজিদা ইসলাম সাইমার ছবি ও পরিচয় ব্যবহার করে সাবেক কমিশনার হাসিব আজিজকে লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়।
ওসি বাবুল আজাদ মডেল সাইমাকে নিজের শালিকা পরিচয়ে কমিশনারের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এরপর ওই রাতেই ‘সানজিদা ইসলাম সাইমা’ নামে একটি ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট তৈরি করে হাসিব আজিজকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠানো হয় বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
নারী কণ্ঠে প্রতারক, এআই দিয়ে তৈরি হলো ডিজিটাল ফাঁদ
তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুবায়েরুল হক জিয়ান ডিজিটাল অ্যাপ ব্যবহার করে নিজের কণ্ঠকে নারী কণ্ঠে রূপান্তর করতেন। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তিকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর অভিযোগও রয়েছে।
এই প্রতারণার কৌশলের কেন্দ্রে ছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।
চ্যাটিংয়ের মাধ্যমে ধীরে ধীরে তৈরি করা হয় ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। এরপর লাইভ ভিডিওর মাত্র ১৫ সেকেন্ডের একটি অংশ কেটে তা এআই প্রযুক্তি ও ডিজিটালি ম্যানিপুলেট করা ভিডিও কলের সঙ্গে ব্যবহার করে সাবেক কমিশনার হাসিব আজিজকে বিভ্রান্ত করা হয় বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরবর্তী সময়ে চারটি অন্তরঙ্গ ভিডিও ধারণ করা হয়। এরপরই শুরু হয় ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ।
চার ভিডিও, তিন মোবাইল নম্বর-তদন্তে কী মিলেছে?
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, হাসিব আজিজের সঙ্গে কথোপকথনে ব্যবহৃত প্রতারকচক্রের তিনটি মোবাইল নম্বর এবং চারটি ভিডিওর সন্ধান পাওয়া গেছে।
এর মধ্যে তিনটি ভিডিও নিজের বলে স্বীকার করলেও একটি ভিডিও এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন হাসিব আজিজ।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই ভিডিও কলের সময় ফেসবুকে সানজিদা ইসলাম সাইমার একটি লাইভ ভিডিওর ১৫ সেকেন্ডের অংশ ডিজিটালি পুনরায় ব্যবহার করা হয়েছিল। সূত্র-আমার দেশ
অর্থাৎ, একটি বাস্তব ভিডিওর অতি সংক্ষিপ্ত অংশকে প্রযুক্তির মাধ্যমে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ব্যবহার করে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল, যা পরবর্তীতে ব্ল্যাকমেইলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে বলে অভিযোগ।
ভিডিও ফাঁসের ভয়েই কি নীরব ছিলেন কর্মকর্তারা?
তদন্ত প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে, সিএমপির তৎকালীন কয়েকজন কর্মকর্তা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত থাকলেও গোপন ভিডিও প্রকাশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করার সাহস পাননি বলে অভিযোগ রয়েছে।
ফলে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার ভয়কে কাজে লাগিয়ে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগটি আরও গুরুতর হয়ে ওঠে।
একদিকে ছিল প্রযুক্তিনির্ভর প্রতারণা, ভুয়া পরিচয় ও ডিজিটাল ম্যানিপুলেশন, অন্যদিকে সেই ব্যক্তিগত তথ্যকে ব্যবহার করে পুলিশ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন ও বদলিতে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ।
পুরো ঘটনাটিকে শুধু একজন ব্যক্তিকে ফাঁদে ফেলার ঘটনা হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত ব্যাপ্তি হয়তো ধরা পড়বে না।
তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এটি পেশাদার কোনো অপরাধীচক্রের কর্মকাণ্ড ছিল না। বরং একজন ডিজিটাল প্রতারক এবং সিএমপিরই দুই ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কথিত আঁতাত দীর্ঘ প্রায় দেড় বছর ধরে চট্টগ্রাম মহানগরীর শান্তিশৃঙ্খলা ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনায় প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করেছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।
যদি তদন্তে ওঠা এসব অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে ঘটনাটি নিছক ‘হানিট্র্যাপ’ বা ব্যক্তিগত ব্ল্যাকমেইলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর সঙ্গে যুক্ত হবে পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে অনৈতিক প্রভাব বিস্তারের গুরুতর প্রশ্ন।
আর সেই কারণেই পাঁচলাইশ থানার ওসি মো. জাহেদুল ইসলামের বদলি এবং একই সঙ্গে একাধিক থানায় নতুন ওসি পদায়নের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
এখন মূল প্রশ্ন-ব্যক্তিগত ভিডিওকে হাতিয়ার বানিয়ে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারের এই অভিযোগের তদন্ত কোথায় গিয়ে থামে এবং তদন্তে উঠে আসা তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে আর কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
চট্টগ্রাম পুলিশের এই চাঞ্চল্যকর ঘটনায় সেই উত্তরই এখন অপেক্ষার।
