চট্টগ্রামের ‘উৎসব সুপার মার্কেট’-নামটি শুনলে আধুনিক বিপণিবিতান ও সুপার শপের একটি পরিচ্ছন্ন চিত্রই সামনে আসার কথা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিষ্ঠানটিকে ঘিরে সামনে এসেছে একের পর এক অভিযোগ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা।
কখনো অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় ও পার্কিং না রাখার অভিযোগে জরিমানা, কখনো পচা ও মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্যপণ্য বিক্রির অভিযোগে ১০ লাখ টাকা জরিমানা।
এর বাইরে বিনিয়োগের অর্থ ও হিসাব-নিকাশ নিয়ে একজন ব্যবসায়ীর অভিযোগ এবং সাবেক এক কর্মীর পক্ষ থেকে নারী কর্মীদের হয়রানির গুরুতর অভিযোগও উঠেছে।
সব অভিযোগের সত্যতা একইভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। তবে একই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে এবং ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে এতগুলো অভিযোগ ওঠায় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে-উৎসব সুপার মার্কেটের ব্যবস্থাপনা, তদারকি ও জবাবদিহির কাঠামো আসলে কতটা কার্যকর?
সাম্প্রতিক দুটি সরকারি অভিযানের নথিভুক্ত ফলাফল অবশ্য প্রশ্নের গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে সিডিএ ও বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের অভিযানে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মোট ১৮ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
নকশা অনুযায়ী ভবন, কিন্তু পার্কিং কোথায়?
সর্বশেষ ২৭ আগস্ট সকালে হালিশহর এক্সেস রোড এলাকায় অভিযান চালায় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-সিডিএ। অভিযানে নেতৃত্ব দেন সিডিএ চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন। সঙ্গে ছিলেন সিডিএর অথরাইজড অফিসার-২ তানজিব হোসেনসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট হামীমুন তানজীন জরিমানার আদেশ দেন।
অভিযানে উৎসব সুপার মার্কেটের অনুমোদিত নকশা পর্যালোচনার সময় বিভিন্ন অসঙ্গতি দেখতে পান সিডিএ কর্মকর্তারা।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে আসে বাণিজ্যিক ভবনের জন্য অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পার্কিং ব্যবস্থা না থাকা।
সিডিএর অথরাইজড অফিসার-২ তানজিব হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযানের সময় মার্কেট কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে অনুমোদিত নকশা দেখাতে পারেনি।
পরিদর্শনে দেখা যায়, বাণিজ্যিক ভবন হলেও নকশা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পার্কিং সুবিধা নেই। কর্তৃপক্ষ রাস্তার জায়গায় গাড়ি পার্কিং করার কথা জানিয়েছে।
এসব অনিয়মের কারণে স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট ৮ লাখ টাকা জরিমানা করেন। জরিমানা অনাদায়ে দেওয়া হয়েছে দুই বছরের কারাদণ্ডের আদেশ।
শুধু জরিমানা করেই বিষয়টি শেষ করেনি সিডিএ। আগামী ২৭ নভেম্বরের মধ্যে নকশায় থাকা ব্যত্যয়কৃত অংশ সংশোধন এবং প্রয়োজনীয় পার্কিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে ভবন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অঙ্গীকারনামাও নেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ, ভবনটির ক্ষেত্রে প্রশ্নটি শুধু জরিমানার নয়; নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সিডিএর অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী বাস্তব পরিস্থিতি সংশোধন করা হয় কি না, সেটিও এখন নজরদারির বিষয়।
এর আগেই খাদ্যপণ্যে মিলেছিল আরও গুরুতর চিত্র
নকশা ও পার্কিং নিয়ে সিডিএর অভিযান শেষ হওয়ার আগেই উৎসব সুপার শপে আরেক সরকারি অভিযানে উঠে আসে ভিন্ন ধরনের অনিয়মের চিত্র।
২২ আগস্ট বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের পরিচালিত অভিযানে উৎসব সুপার শপে মানহীন আচার ও হোমমেইড পণ্য, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে মাংস সংরক্ষণ, মেয়াদোত্তীর্ণ মোমোস সংরক্ষণ ও বিক্রি এবং আমদানিকৃত খাদ্যপণ্যে যথাযথ লেবেলিং না থাকার মতো অনিয়ম শনাক্ত হওয়ার কথা জানানো হয়।
অভিযানে আরও পাওয়া যায়—আমদানিকৃত পণ্যের মূল পুষ্টিতথ্যের ওপর নিজস্ব স্টিকার লাগানো, আমদানিকারকের যথাযথ তথ্য ছাড়া খাদ্যপণ্য বিক্রি, জিলাপিতে ব্যবহৃত রঙের তথ্য না থাকা এবং কোল্ড স্টোরেজ যথাযথভাবে পরিচালিত না হওয়ার অভিযোগ।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল নষ্ট খাদ্যপণ্য সংরক্ষণ ও বিক্রি এবং প্রয়োজনীয় নিবন্ধন ও অনুমোদন ছাড়া শিশুখাদ্য, ফুড সাপ্লিমেন্ট ও হোমমেইড পণ্য বিক্রির অভিযোগ।
এ ছাড়া একই অননুমোদিত সরঞ্জামে গরু ও খাসির মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং অনুমতি ছাড়া ঘরোয়া আচার ও অন্যান্য পণ্য বিক্রির তথ্যও অভিযানে উঠে আসে।
এসব অনিয়মের দায়ে প্রতিষ্ঠানটিকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানা অনাদায়ে তিন মাসের কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি আমদানিকৃত ফলমূলের ক্রয়মূল্য ও সংশ্লিষ্ট তথ্য আদালতে উপস্থাপন এবং যথাযথ অনুমোদন ও পুষ্টিতথ্য ছাড়া আচার ও হোমমেইড পণ্য বিক্রি বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়।
এখানেই শেষ নয়। খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে এমন অভিযোগ সরাসরি ভোক্তার স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় বিষয়টি কেবল ব্যবসায়িক অনিয়মের পর্যায়ে থাকে না-এটি জনস্বাস্থ্যের প্রশ্নও তৈরি করে।
১২ লাখ টাকার বিনিয়োগ, চুক্তি ও হিসাব নিয়ে ব্যবসায়ীর অভিযোগ
উৎসব সুপার মার্কেটকে ঘিরে আরেকটি অভিযোগ এসেছে একজন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে। তাঁর নাম ছাদেক আলী।
ছাদেক আলীর অভিযোগ, সুপার মার্কেট প্রতিষ্ঠার ব্যবসায়িক পরিকল্পনা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কাজ করার ধারাবাহিকতায় তাঁকে প্রতিষ্ঠানটির অপারেশনাল দায়িত্বের পাশাপাশি অংশীদার হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এরপর ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি ১২ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন।
তাঁর দাবি, চুক্তি অনুযায়ী ওই বিনিয়োগের বিপরীতে প্রতিষ্ঠানের ন্যূনতম ৫ শতাংশ লভ্যাংশ পাওয়ার কথা ছিল। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে উৎসব সুপার মার্কেট আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়।
কিন্তু অভিযোগের এখানেই শুরু হয় নতুন অধ্যায়।
ছাদেক আলীর ভাষ্য, উদ্বোধনের পর তাঁকে মূল চুক্তিপত্রের কোনো কপি দেওয়া হয়নি। বারবার চাইলেও বিষয়টি বিভিন্ন অজুহাতে এড়িয়ে যাওয়া হয়। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক অডিট ও আয়-ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাবও তাঁকে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ তাঁর।
প্রথমদিকে তাঁকে প্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হলেও পরে কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা ছাড়াই তা কমিয়ে ২০ হাজার টাকা করা হয় বলে দাবি করেন তিনি।
এরপর মূল চুক্তিপত্র ও প্রকৃত হিসাব-নিকাশ চাইলে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয় বলে অভিযোগ তাঁর।
হিসাবের অঙ্ক নিয়েও প্রশ্ন
ছাদেক আলীর অভিযোগ অনুযায়ী, গত বছরের অক্টোবর মাসে প্রতিষ্ঠানটির অ্যাকাউন্টস ম্যানেজার মো. জহির তাঁকে একটি হিসাব বিবরণী দেন। সেখানে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত হিসাব দেখিয়ে তাঁর ১২ লাখ টাকা বিনিয়োগের বিপরীতে প্রাপ্য হিসেবে ১০ লাখ ৯৮ হাজার ২৪৮ টাকা উল্লেখ করা হয়।
ছাদেক আলী এই হিসাবকে মনগড়া ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন। তাঁর প্রশ্ন-বিনিয়োগের অর্থ, লভ্যাংশ, প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত আয়-ব্যয় এবং হিসাব নিরীক্ষার নথি যদি স্বচ্ছ থাকে, তাহলে সেগুলো তাঁকে পূর্ণাঙ্গভাবে দেওয়া হচ্ছে না কেন?
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি-হিসাবের এই অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট চুক্তিপত্র, অডিট রিপোর্ট, ব্যাংক লেনদেন ও হিসাব নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন। কেবল অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো পক্ষকে দায়ী করা যায় না।
রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাব ও হুমকির অভিযোগ
ছাদেক আলীর অভিযোগ আরও গুরুতর। তাঁর দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুচ সালামের ভাগিনা ও আত্মীয় পরিচয় ব্যবহার করে তাঁকে ভয়ভীতি দেখানো হয়েছিল। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে দীর্ঘ সময় প্রকাশ্যে অভিযোগ করতে সাহস পাননি বলেও দাবি তাঁর।
পরে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার পর বিনিয়োগকৃত মূলধন ও প্রাপ্য লভ্যাংশ ফেরত পাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে আসছেন বলে জানান তিনি।
বর্তমানে পাওনা টাকা ফেরত চাইলে বিভিন্ন মাধ্যমে তাঁকে প্রাণনাশ ও বড় ধরনের ক্ষতির হুমকি দেওয়া হচ্ছে-এমন অভিযোগও করেছেন তিনি।
নিজের নিরাপত্তা, বিনিয়োগের অর্থ ও প্রাপ্য লভ্যাংশ ফেরত এবং ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত চেয়ে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বলে জানান ছাদেক আলী।
এই অভিযোগগুলোরও স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন।
কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়েও অভিযোগ
উৎসব সুপার শপের একজন সাবেক কর্মী মোহাম্মদ রাসেল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বক্তব্যে প্রতিষ্ঠানটির এক ইনচার্জের বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন।
রাসেলের অভিযোগ, আলমগীর জয় নামে একজন ইনচার্জ কিছু নারী কর্মচারীর ওপর চাকরি হারানোর ভয় দেখিয়ে চাপ সৃষ্টি করতেন এবং যৌন সম্পর্কিত অনাকাঙ্ক্ষিত প্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব প্রস্তাবে রাজি না হলে চাকরি থেকে বের করে দেওয়ার ভয় দেখানো হতো বলেও দাবি করেছেন তিনি।
তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য এবং স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। ফলে এটিকে অভিযোগ হিসেবেই দেখা প্রয়োজন।
রাসেল নিজেও ম্যানেজমেন্টের কাছে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। নারী কর্মীদের গোপনীয়ভাবে বক্তব্য নেওয়া এবং অভিযোগ সত্য হলে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
উৎসব সুপার মার্কেটকে ঘিরে সামনে আসা ঘটনাগুলো পাশাপাশি রাখলে চিত্রটি বেশ বিস্তৃত।
একদিকে সিডিএর অভিযানে অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় ও বাণিজ্যিক ভবনে প্রয়োজনীয় পার্কিং না থাকার অভিযোগে ৮ লাখ টাকা জরিমানা।
অন্যদিকে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের অভিযানে খাদ্যপণ্যের মান, মেয়াদ, লেবেলিং, নিবন্ধন, সংরক্ষণ ও অনুমোদন নিয়ে একাধিক অনিয়মের অভিযোগে ১০ লাখ টাকা জরিমানা।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ১২ লাখ টাকা বিনিয়োগের অর্থ, চুক্তি, লভ্যাংশ ও হিসাব নিয়ে ব্যবসায়ী ছাদেক আলীর অভিযোগ। পাশাপাশি রয়েছে সাবেক কর্মী মোহাম্মদ রাসেলের করা কর্মক্ষেত্রে নারী কর্মীদের হয়রানির অভিযোগ।
অর্থাৎ অভিযোগগুলোর ধরন এক নয়। কোনোটি ভবনের অনুমোদন ও নগর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পর্কিত, কোনোটি সরাসরি খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে, কোনোটি ব্যবসায়িক লেনদেনের সঙ্গে এবং অন্যটি কর্মপরিবেশের সঙ্গে।
তাই প্রশ্নটিও এখন শুধু-‘উৎসব সুপার মার্কেটকে কেন জরিমানা করা হলো?’-এখানে সীমাবদ্ধ থাকার কথা নয়।
সকল অভিযোগের বিষয়ে উৎসব সুপার শপের কর্তৃপক্ষের সাথে একাধিকবার যোগোযোগের চেষ্টা করা হলেও কোন সাড়া পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে তাদের ওয়েভসাইটে দেওয়া 018*445***2 এবং 018*9**0**1 নাম্বার দুটির হোয়াটসঅ্যাপে কিছু প্রশ্ন রেখে বার্তা পাঠালেও সেখান থেকে কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
