উত্থান, ব্যর্থতা, বিশ্বজয়, তারপর বিদায়-শেষ হলো মেসির আর্জেন্টিনা অধ্যায়

প্রকাশিত: ০১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:৪৫

যে দিনটির কথা কেউ ভাবতে চাননি, শেষ পর্যন্ত সেই দিনই এসে গেল। আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা জার্সিতে আর দেখা যাবে না লিওনেল মেসিকে।

হাতে লেখা এক আবেগঘন চিঠি এবং সঙ্গে একটি ভিডিও বার্তায় জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন ৩৯ বছর বয়সী এই মহাতারকা।

আর সেই ঘোষণার সঙ্গে যেন শেষ হয়ে গেল আর্জেন্টিনা ফুটবলের সবচেয়ে গৌরবময় এক অধ্যায়।

শূন্য হয়ে গেল সেই বিখ্যাত ১০ নম্বর জার্সি।

মেসির বিদায় অবশ্য একেবারে আচমকা নয়। অনেক দিন ধরেই ইঙ্গিত মিলছিল, আর্জেন্টিনার হয়ে শেষ সময়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

তবু আনুষ্ঠানিক ঘোষণাটি আসার পর এর ধাক্কা সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে দেশটির মানুষের জন্য। শুধু আর্জেন্টিনা নয়, পুরো ফুটবল বিশ্বই যেন থমকে গেছে।

কারণ, মেসির জাতীয় দলের গল্পটা শুধুই সাফল্যের গল্প নয়।

এটি উত্থানের গল্প। ব্যর্থতার গল্প। হতাশা থেকে ফিরে আসার গল্প। অভিমান, বিদায়, প্রত্যাবর্তন এবং শেষ পর্যন্ত কিংবদন্তিতে পরিণত হওয়ার এক অবিশ্বাস্য যাত্রা।

ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই দিয়েগো ম্যারাডোনার সঙ্গে তুলনা শুনতে হয়েছে মেসিকে। সেই তুলনার ভার কখনো আশীর্বাদ হয়েছে, কখনো অভিশাপ।

একটির পর একটি ফাইনালে হার, সমালোচনার ঝড়, জাতীয় দলের হয়ে শিরোপা না জেতার আক্ষেপ-সবকিছুই ছিল তার পথচলার অংশ।

২০১৪ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালের হার। ২০০৭, ২০১৫ ও ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে পরাজয়।আর ২০১৬ সালে তো অভিমানেই জাতীয় দল থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি।

সেদিন অনেকেই ভেবেছিলেন, হয়তো সেখানেই শেষ। কিন্তু কিংবদন্তির গল্প এত সহজে শেষ হয় না। ফিরে এসেছিলেন মেসি। তারপর ধীরে ধীরে বদলে যায় সবকিছু। কোপা আমেরিকা। ফিনালিসিমা। বিশ্বকাপ।

একসময় যে মানুষটির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল, জাতীয় দলের হয়ে কী জিতেছেন মেসি?-কাতারে বিশ্বকাপ জয়ের পর সেই প্রশ্নই যেন চিরতরে হারিয়ে যায়।

তিনি পৌঁছে যান এমন এক উচ্চতায়, যেখান থেকে আর কোনো প্রমাণ দেওয়ার প্রয়োজন ছিল না।

তবু কেন এই বিদায়?

সিদ্ধান্তের সব কারণ একমাত্র মেসি ও তার ঘনিষ্ঠরাই জানেন। তবে নিজের বিদায়ী বার্তার শেষ অংশে একটি বিষয় তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন।

সেটি হলো, তার বাবা হোর্হে মেসির মৃত্যু। মেসি লিখেছেন, আমি এই কথাগুলো লিখেছিলাম ২১ জুলাই, ফাইনালের দুই দিন পর। আজ, আমার বাবার সঙ্গে যা ঘটেছে, তার পর আমি আগের চেয়েও বেশি নিশ্চিত।

এই কয়েকটি বাক্যেই যেন লুকিয়ে আছে বিদায়ের সবচেয়ে গভীর বেদনা। মেসির বাবা হোর্হে ছিলেন শুধু তার বাবা নন। ছিলেন সবচেয়ে কাছের মানুষ, আস্থার জায়গা এবং সবচেয়ে বড় ভক্ত।

রোজারিওর ক্লাব গ্রানদোলিতে খেলা সেই ছোট্ট কিশোর মেসি থেকে শুরু করে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠে আসা পর্যন্ত ছেলের প্রতিটি সাফল্যের সাক্ষী ছিলেন তিনি।

মেসি যেমন গোল করার পর প্রয়াত দাদি সেলিয়ার স্মরণে দুই হাতের তর্জনী আকাশের দিকে তোলেন, তেমনি তার ক্যারিয়ারের প্রতিটি ধাপে বাবাকে গর্বিত করাটাও ছিল বড় প্রেরণা।

৮ আগস্ট রোজারিওতে হোর্হের মৃত্যু তাই মেসির জীবনে শুধু একজন অভিভাবককে হারানোর ঘটনা ছিল না।তিনি হারিয়েছেন নিজের সবচেয়ে বড় সমর্থককে। হারিয়েছেন সবচেয়ে বিশ্বস্ত মানুষটিকে।

বিদায়ের সিদ্ধান্তের সঙ্গে সেই শোক কতটা গভীরভাবে জড়িয়ে আছে, মেসির নিজের কথাতেই তার আভাস পাওয়া যায়।

বয়সও বলছে, এবার থামার সময়

তবে শুধু পারিবারিক শোকই নয়, বয়সও মেসির সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রেখেছে। ফুটবলের সময়কে মেসি অন্য অনেকের চেয়ে ভালোভাবেই বোঝেন। ৩৯ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে ২০৩০ বিশ্বকাপ এখন অনেক দূরের পথ।

এমনকি ২০২৮ সালের কোপা আমেরিকাও তার জন্য খুব কাছের কোনো গন্তব্য নয়। শেষ বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া উচিত কি না, সেই সিদ্ধান্ত নিতে গিয়েও তাকে কঠিন মানসিক লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল।

মেসি লিখেছেন, এটি এমন একটি সিদ্ধান্ত ছিল, যা আমাকে ভেতর থেকে কষ্ট দিয়েছে এবং এখনো দিচ্ছে। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি, এটাই সঠিক সময়। এই সিদ্ধান্তের পেছনে বাস্তবতাকেও অস্বীকার করেননি তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকারে এখনো তিনি পার্থক্য গড়ে দিতে পারেন। সাম্প্রতিক আট ম্যাচে করেছেন আট গোল, যার মধ্যে অভিষেকেই ছিল হ্যাটট্রিক। সঙ্গে রয়েছে চারটি অ্যাসিস্ট। অর্থাৎ বয়স বাড়লেও বল পায়ে মেসির জাদু এখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।

কিন্তু ক্লাব ফুটবল আর জাতীয় দলের দায়িত্ব এক নয়। জাতীয় দলের হয়ে খেলতে হলে নিজেকে পুরোপুরি উজাড় করে দিতে হয়।

সেখানে শুধু শারীরিক সক্ষমতা কিংবা মাঠের পারফরম্যান্সই যথেষ্ট নয়। মানসিকভাবেও থাকতে হয় সর্বোচ্চ অবস্থায়।

আর মেসি নিজেই স্বীকার করেছেন, সেই জায়গায় তিনি আর নেই। তার ভাষায়, আমার ভেতরটা শূন্য। আর কিছু দেওয়ার মতো আমার কাছে নেই।

একটি যুগের সমাপ্তি হয়তো এর চেয়ে বেশি বেদনাদায়ক ভাষায় বলা সম্ভব নয়।

জাতীয় দল ছাড়ার সময় মেসির হাতে রয়েছে পরিপূর্ণ এক উত্তরাধিকার। তিনি বিদায় নিচ্ছেন বিশ্বকাপজয়ী হিসেবে। দুইবারের কোপা আমেরিকা চ্যাম্পিয়ন হিসেবে। ফিনালিসিমাজয়ী হিসেবে।

অবশ্য তার শিরোপার সংখ্যা আরও বাড়তে পারত। ২০০৭, ২০১৫ ও ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনাল এবং ২০১৪ সালের বিশ্বকাপের ফাইনালে হারের তিক্ত স্মৃতিও তার ক্যারিয়ারের অংশ হয়ে আছে।

কিন্তু ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তাকে মনে রাখবে সেই মানুষ হিসেবে, যিনি বারবার ব্যর্থ হওয়ার পরও হাল ছাড়েননি।

ফিরে এসেছেন। লড়েছেন। জিতেছেন এবং শেষ পর্যন্ত নিজের দেশের জন্য সবচেয়ে বড় স্বপ্নটিও পূরণ করেছেন। তাই বলা যায়, শেষটা হয়েছে স্বপ্নের মতোই।

একসময় যে তরুণরা মেসিকে ছোটবেলার আদর্শ মেনে ফুটবলে এসেছিলেন, হুলিয়ান আলভারেজ, ক্রিস্তিয়ান রোমেরো, এনজো ফার্নান্দেজ, আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্তারসহ আরও অনেকে পরে আর্জেন্টিনার সোনালি প্রজন্মের অংশ হয়েছেন।

এখন তাদের পরবর্তী প্রজন্মও জাতীয় দলের দরজায় কড়া নাড়ছে। নিকো পাজ, ভ্যালেন্তিন বারকোর মতো তরুণদের সামনে জায়গা করে দিতে চান মেসি।

সেই কারণটিও বিদায়ী বার্তায় স্পষ্ট করেছেন তিনি। মেসির ভাষায়, আমাদের পেছনে বেশ কিছু দারুণ প্রতিভাবান ছেলে উঠে আসছে, যারা সেখানে থাকার যোগ্য। হয়তো এটাই একজন সত্যিকারের কিংবদন্তির সবচেয়ে বড় পরিচয়।

নিজের সময় শেষ হলেও তিনি চান, দল এগিয়ে যাক। নিজের জায়গা আঁকড়ে ধরে রাখার বদলে তিনি জায়গা করে দিতে চান ভবিষ্যতের জন্য।

মেসির বিদায় তাই শুধু একজন ফুটবলারের অবসর নয়। এটি আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের ইতিহাসের একটি যুগের সমাপ্তি।

যে ১০ নম্বর জার্সি একসময় দিয়েগো ম্যারাডোনার গায়ে ছিল, পরে যার সঙ্গে লিওনেল মেসি এমনভাবে মিশে গেছেন যে দুটিকে আলাদা করে ভাবাই কঠিন-সেই জার্সিই এবার নতুন কারও অপেক্ষায়।

একসময় ম্যারাডোনা বিদায় নিয়েছিলেন। তারপর এসেছিলেন মেসি। এবার মেসিও চলে গেলেন। কিন্তু আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে তার নাম থেকে যাবে চিরকাল।

গোলের জন্য। শিরোপার জন্য। অশ্রুর জন্য। ফিরে আসার জন্য। আর সবচেয়ে বেশি-একটি অসম্ভব যাত্রাকে সম্ভব করে তোলার জন্য।

আর্জেন্টিনার জার্সিতে আর হয়তো দেখা যাবে না সেই পরিচিত ১০ নম্বরকে। আর মাঠে নামার আগে হয়তো আর শোনা যাবে না কোটি মানুষের সেই প্রত্যাশার শব্দ। তবু ফুটবল যত দিন থাকবে, আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা রঙের সঙ্গে একটি নাম বারবার ফিরে আসবে-লিওনেল মেসি।

একটি যুগ শেষ হলো। কিন্তু কিংবদন্তিরা কখনো সত্যিকার অর্থে বিদায় নেন না।