স্বামী-স্ত্রীর সাড়ে চার কোটির সম্পত্তি: বিপিসির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার দুর্নীতির তদন্তে দুদক

প্রকাশিত: ০৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০২:৪৪

ন্যূনতম দ্বিতীয় শ্রেণীর স্নাতক ডিগ্রি থাকার বাধ্যবাধকতা সত্ত্বেও জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) মতো রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা পদে আসীন হন সাবেক কর্মকর্তা মনি লাল দাশ। পদোন্নতি পেতে পেতে তিনি পৌঁছে যান জ্যেষ্ঠ মহাব্যবস্থাপক পদে। তবে কেবল নিয়োগ জালিয়াতিতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি তিনি; সততার মুখোশের আড়ালে গড়ে তুলেছেন বিপুল পরিমাণে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত অবৈধ সম্পদ। এমনকি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধান ও গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর নিজের অপরাধ ঢাকতে নথিপত্র গায়েব করে দেওয়ার গুরুতর অভিযোগও উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।

জালিয়াতি দিয়ে শুরু, শেষ মহাব্যবস্থাপক পদে অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৯৬ সালের ২৪ অক্টোবর দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকায় প্রকাশিত বিপিসির সহকারী ম্যানেজার পদের বিজ্ঞপ্তিতে ন্যূনতম দ্বিতীয় শ্রেণীর স্নাতক পাশ চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু মনি লাল দাশের শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল তৃতীয় শ্রেণী। যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও অদৃশ্য ক্ষমতার জোরে ১৯৯৯ সালে সহকারী ব্যবস্থাপক (এমআইএস) পদে যোগ দেন তিনি। পরবর্তীতে পদোন্নতি পেতে পেতে মহাব্যবস্থাপক (অর্থ ও হিসাব) এবং সর্বশেষ জ্যেষ্ঠ মহাব্যবস্থাপক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি যৌথ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল লিমিডেটের (এসএওসিএল) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবেও বহাল ছিলেন। চলতি বছরের ১৩ আগস্ট অবসরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় এ প্রতিষ্ঠানে অবাধে অনিয়ম ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতি সাধন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

তদন্ত এড়াতে নথি গায়েব বিপিসির একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অবসরে গেলেও মনি লালের অনিয়মের বিচার এখনো হয়নি। উপরন্তু গণমাধ্যমে দুর্নীতির খবর আসার পর নিজের জালিয়াতির প্রমাণ মুছে ফেলতে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ও নথি গায়েব করে ফেলেছেন তিনি। বর্তমানে সেসব ফাইলে আর কোনো হদিস মিলছে না বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মচারীরা।

স্বামী-স্ত্রীর সাড়ে চার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ মনি লালের সবচেয়ে মারাত্মক অনিয়ম উন্মোচিত হয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধানে। ২০২৩ সাল থেকে শুরু হওয়া তদন্তে মনি লাল দাশ ও তাঁর স্ত্রী সেপিকা দাশের নামে আড়াই কোটি টাকারও বেশি জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের প্রাথমিক তথ্য পেয়েছে দুদক।

  • মনি লাল দাশ: তাঁর স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ও পারিবারিক ব্যয়সহ মোট ৪ কোটি ১৭ লাখ ২৭ হাজার ২০৭ টাকার সম্পদের বিপরীতে বৈধ উৎস পাওয়া গেছে ৩ কোটি ৪০ লাখ ৯২ হাজার ১৯৩ টাকার। অর্থাৎ, তাঁর অন্তত ৭৬ লাখ ৩৫ হাজার ১৪ টাকার সম্পদের কোনো গ্রহণযোগ্য উৎস নেই।

  • সেপিকা দাশ: পেশায় গৃহিণী হলেও ২০১০-১১ করবর্ষ থেকে সঞ্চয়পত্র, শেয়ার, কমিশন ব্যবসা ও মৎস্য চাষের ভুয়া পরিচয় দিয়ে অবৈধ টাকা বৈধ করার চেষ্টা করেছেন। অনুসন্ধানে তাঁর এসব ব্যবসার কোনো অস্তিত্ব বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাঁর ২ কোটি ৪৪ লাখ ৬১ হাজার ৯২৭ টাকার অর্জিত সম্পদের বিপরীতে অন্তত ১ কোটি ৮৭ লাখ ১৭ হাজার ২৫৫ টাকার আয়ের কোনো বৈধ উৎস মেলেনি।

দৃশ্যমান আইনি পদক্ষেপের দাবি দুদকের অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা ও সহকারী পরিচালক রাজু আহমেদ স্বামী-স্ত্রী উভয়ের বিরুদ্ধে সম্পদ বিবরণী দাখিলের সুপারিশ করে কমিশনে প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। দুদক সূত্রে জানা গেছে, কমিশনের অনুমোদন সাপেক্ষে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

অন্যদিকে, এসব অভিযোগ নিয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও মনি লাল দাশের সাথে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে ২০২৪ সালে এক প্রতিক্রিয়া জানিয়ে তিনি দাবি করেছিলেন, একটি চক্র তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে এবং অতীতে তিনি টিউশনি করেও জীবনযাপন করেছেন।

অবসরে যাওয়া এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জাতীয় স্বার্থে অবিলম্বে সুষ্ঠু তদন্ত, নথিপত্র উদ্ধারের ব্যবস্থা এবং দৃশ্যমান আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য জোর দাবি জানিয়েছেন বিপিসির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।