কাগজে গাড়ির যন্ত্রাংশ, কনটেইনার খুলতেই বের হলো আস্ত BMW!

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ০৭ অক্টোবর, ২০২৬ ১৪:০৮

কাগজপত্রে পুরোনো গাড়ির যন্ত্রাংশ। কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দরের পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালে কনটেইনার খুলতেই মিলল ভিন্ন চিত্র।

তল্লাশিতে বেরিয়ে এসেছে একটি আস্ত বিএমডব্লিউ, পাঁচটি হাফ-কাট ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহনের বিপুল পরিমাণ যন্ত্রাংশ। জাপান থেকে আনা এই চালান ঘিরে শুল্ক ফাঁকির অভিযোগে তদন্ত শুরু করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর।

কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চালানটি জাপান থেকে আনা হয় ‘ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ’ হিসেবে। তবে কনটেইনার খুলে তল্লাশি চালানোর পর ঘোষণাপত্রের সঙ্গে প্রকৃত পণ্যের মিল পাওয়া যায়নি। বরং সেখানে পাওয়া গেছে বিলাসবহুল বিভিন্ন গাড়ির অংশ ও বিপুল পরিমাণ যন্ত্রাংশ।

এমন ঘটনা অবশ্য এবারই প্রথম নয়। এর আগেও চট্টগ্রাম বন্দরে একই ধরনের চালান তল্লাশি করে লেক্সাস, বিএমডব্লিউসহ বিলাসবহুল গাড়ির খণ্ডিত অংশ উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। ফলে ‘ইউজড কার পার্টস’-এর ঘোষণার আড়ালে কীভাবে সম্পূর্ণ বা প্রায় সম্পূর্ণ গাড়ি দেশে ঢুকছে, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

কাস্টমস গোয়েন্দার অনুসন্ধানে সম্প্রতি জাপান থেকে আসা একটি ৪০ ফুট কনটেইনারে ১৬৭ প্যাকেজে প্রায় ৮ হাজার ১৮ কেজি পণ্য পাওয়া যায়।

চালানটির ঘোষণায় ছিল পুরোনো গাড়ির যন্ত্রাংশ, গিয়ারবক্সসহ ব্যবহৃত পেট্রল ইঞ্জিন। কিন্তু কনটেইনার খুলে তল্লাশি চালানোর পর পাওয়া যায় লেক্সাস এলএক্স ৬০০, লেক্সাস এসসি ৪৩০ ও বিএমডব্লিউ এম৫-এর বিভিন্ন অংশ।

এর সঙ্গে ছিল হাফ-কাট এবং হোন্ডা বি১৮সি টাইপ-আর ইঞ্জিনসহ বিপুল পরিমাণ যন্ত্রাংশ।

কাস্টমসের হিসাবে, এসব পণ্যের সম্ভাব্য মূল্য ৯ কোটি ৫০ লাখ থেকে ১২ কোটি টাকা।

অর্থাৎ কাগজে যেখানে পুরোনো গাড়ির যন্ত্রাংশের ঘোষণা, বাস্তবে সেখানে মিলেছে উচ্চমূল্যের বিলাসবহুল গাড়ির অংশ ও বিভিন্ন যানবাহনের দামি যন্ত্রাংশ। এই অমিলই এখন কাস্টমস গোয়েন্দার তদন্তের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু।

কাস্টমস কর্মকর্তাদের ধারণা, গাড়ি সম্পূর্ণ অবস্থায় আমদানি না করে সেটিকে কয়েকটি অংশে কেটে ‘ইউজড কার পার্টস’ হিসেবে ঘোষণা করা হলে শুল্ক-কর কমানোর সুযোগ তৈরি হয়। চট্টগ্রাম বন্দরের সাম্প্রতিক কয়েকটি চালানের ঘটনায় এমন কৌশলের প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছে কাস্টমস গোয়েন্দা সংস্থা।

গাড়িকে খণ্ডিত করে আলাদা আলাদা যন্ত্রাংশ হিসেবে ঘোষণা করার মাধ্যমে প্রকৃত পণ্যের পরিচয় ও মূল্য আড়াল করা হচ্ছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

বিশেষ করে ঘোষণাপত্রে উল্লেখ করা পণ্যের সঙ্গে কনটেইনারে পাওয়া মালামালের ধরন, পরিমাণ ও সম্ভাব্য বাজারমূল্যের পার্থক্য তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।

এর আগে চট্টগ্রাম নগরের রহমতগঞ্জে একটি বিএমডব্লিউ গাড়িও আটক করা হয়। কাস্টমস গোয়েন্দার দাবি, আমদানি করা যন্ত্রাংশ দিয়ে স্থানীয় একটি গ্যারেজে গাড়িটি পূর্ণাঙ্গ করা হয়েছিল।

আরও চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, গাড়িটিতে পুরোনো একটি বিএমডব্লিউর রেজিস্ট্রেশন নম্বর ব্যবহার করা হচ্ছিল। ফলে আমদানি করা খণ্ডিত গাড়ির অংশ দেশে এনে সেগুলো জোড়া দিয়ে পূর্ণাঙ্গ গাড়িতে রূপ দেওয়ার একটি সম্ভাব্য চিত্রও সামনে এসেছে।

কাস্টমস গোয়েন্দা সূত্র বলছে, তদন্তের পরিধি শুধু শুল্ক ফাঁকির অভিযোগেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। এসব চালানে মিথ্যা ঘোষণা, প্রয়োজনীয় তথ্য গোপন, চোরাচালান কিংবা অর্থ পাচারের কোনো যোগসূত্র আছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এ জন্য সংশ্লিষ্ট চালানের আমদানি মূল্য, অর্থ পরিশোধের তথ্য, বাণিজ্যিক দলিল এবং সংশ্লিষ্ট লেনদেন পরীক্ষা করা হচ্ছে। ঘোষণাপত্রের তথ্যের সঙ্গে বাস্তবে আমদানি করা পণ্যের মিল কোথায় এবং কীভাবে এই অমিল তৈরি হলো, তারও অনুসন্ধান চলছে।

কাস্টমস কর্মকর্তাদের মতে, এ ধরনের চালান শনাক্ত করতে পণ্যের ঘোষণার সঙ্গে কনটেইনারের প্রকৃত মালামাল মিলিয়ে দেখা জরুরি। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ আমদানিকারকদের চালানকে বিশেষ নজরদারির আওতায় আনার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।

তাদের মতে, বিলাসবহুল গাড়ি কিংবা উচ্চমূল্যের যন্ত্রাংশের ক্ষেত্রে ঘোষিত পণ্যের ধরন ও প্রকৃত মালামালের মধ্যে সামান্য অমিলও বড় ধরনের শুল্ক ফাঁকির ইঙ্গিত হতে পারে।

এদিকে আটক পণ্যের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করে আইন অনুযায়ী শুল্ক-কর ও জরিমানা আদায়ের প্রক্রিয়া নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।