মানস চৌধুরী, বিশেষ প্রতিবেদক:
বাংলাদেশের প্রধান অর্থনৈতিক প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের শীর্ষ নেতৃত্বে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বর্তমান প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ এবং ব্যবস্থাপনায় ঘাটতির অভিযোগে সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের বিষয়টি জোরালোভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
এই গুরুত্বপূর্ণ পদের জন্য সম্ভাব্য তালিকায় সবচেয়ে এগিয়ে আছেন বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বিএসসি-তে তাঁর সাম্প্রতিক অভাবনীয় সাফল্য এবং আর্থিক শৃঙ্খলা সরকারের উচ্চমহলকে আকৃষ্ট করেছে।
বন্দরে অসন্তোষ ও নেতৃত্বের সংকট
বন্দর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একটি বড় অংশের দাবি, বর্তমান চেয়ারম্যানের বেশ কিছু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং কার্যক্রম পরিচালনার ধীরগতি দেশের এই প্রধান সমুদ্রবন্দরের গতিশীলতাকে বাধাগ্রস্ত করছে। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে বন্দরের দক্ষতা বৃদ্ধি যখন জরুরি, তখন বর্তমান নেতৃত্বের সক্ষমতা নিয়ে সরকারের বিভিন্ন স্তরেও প্রশ্ন উঠেছে।
এই স্থবিরতা কাটিয়ে উঠতে সরকার একজন দক্ষ, সৎ এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম ‘ক্রাইসিস ম্যানেজার’ খুঁজছে, যার পটভূমি কমোডর মালেকের প্রোফাইলের সঙ্গে মিলে যায়।
বিএসসি-র ‘টার্নঅ্যারাউন্ড’ ও বিরল আর্থিক রেকর্ড
দীর্ঘদিন ধরে লোকসান এবং অদক্ষ ব্যবস্থাপনার বৃত্তে আটকে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনকে (বিএসসি) মাত্র কয়েক বছরে দেশের অন্যতম লাভজনক সংস্থায় রূপান্তর করেছেন কমোডর মালেক।
বিএসসি-র আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী:
রেকর্ড নিট মুনাফা: ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি ২৫০ কোটি টাকা মুনাফা করে, যা ছিল এর ৫৩ বছরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। পরবর্তী ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে সেই রেকর্ড ভেঙে নিট মুনাফা দাঁড়ায় ৩০৬ কোটি টাকায়।
রাষ্ট্রীয় তহবিলে অর্থ ফেরত: অর্থনৈতিক স্বচ্ছতার এক বিরল নজির স্থাপন করে তিনি ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রধান উপদেষ্টার কাছে ৪৭৫ কোটি টাকা ফেরত দেন। এরপর চলতি বছরের (২০২৬) ১৪ জানুয়ারি আরও ২০৩ কোটি টাকার চেক রাষ্ট্রীয় তহবিলে হস্তান্তর করেন।
শুধু আর্থিক ব্যবস্থাপনাই নয়, তাঁর নেতৃত্বে বিএসসি প্রথমবারের মতো নিজস্ব অর্থায়নে ৬৩ হাজার ৫০০ টন ধারণক্ষমতার দুটি বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজ সংগ্রহ করেছে। পাশাপাশি সরকারি অর্থায়নে আরও তিনটি মাঝারি আকারের জাহাজ সংগ্রহের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
পেশাগত প্রোফাইল: এক নজরে কমোডর মালেক
বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ২৪তম দীর্ঘমেয়াদি কোর্সের এই কর্মকর্তা তাঁর কর্মজীবনে বহু গুরুত্বপূর্ণ স্ট্র্যাটেজিক ও অপারেশনাল দায়িত্ব পালন করেছেন।
| ক্ষেত্র | বিবরণ |
| অভিজ্ঞতা | যুদ্ধজাহাজের অধিনায়ক, নৌ সদর দপ্তরের পরিচালক এবং সাবমেরিন কমান্ডার। |
| ঐতিহাসিক অর্জন | তাঁর নেতৃত্বেই কোনো বিদেশি সাহায্য ছাড়া বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সাবমেরিন প্রথমবার সমুদ্রে ডাইভিং ও সফল অপারেশনের সক্ষমতা অর্জন করে। |
| শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ | যুক্তরাষ্ট্রের নেভাল ওয়ার কলেজ, পাকিস্তানের ন্যাশনাল ডিফেন্স ইউনিভার্সিটি এবং বাংলাদেশের এনডিসি থেকে উচ্চতর ডিগ্রি। জাতীয় নিরাপত্তা কোর্সে প্রথম স্থান অর্জন। |
বন্দর সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা
চট্টগ্রাম বন্দরের একাধিক কর্মকর্তা ও অংশীজন ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাছে কমোডর মাহমুদুল মালেককে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএসসি-র মতো একটি জটিল ও ঋণগ্রস্ত সংস্থাকে যেভাবে তিনি লাভজনক ও আধুনিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করেছেন, তা বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের ইতিহাসে একটি বিরল উদাহরণ। চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করে বৈশ্বিক মানে উন্নীত করতে তাঁর মতো একজন দূরদর্শী ও প্রশাসনিকভাবে দক্ষ নেতাই এই মুহূর্তে প্রয়োজন।

