দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবার প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রামের হাজারী লেন। সারিবদ্ধ ওষুধের দোকান ও ব্যস্ত পাইকারি কারবারের আড়ালে এখানে দীর্ঘ চার দশক ধরে বিস্তৃত হয়েছে এক অদৃশ্য অপরাধ নেটওয়ার্ক।
ঢাকার কেরানীগঞ্জ ও মিটফোর্ড থেকে শুরু করে হাজারী লেন হয়ে চট্টগ্রাম বিভাগের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে সরবরাহ করা হচ্ছে নকল, ভেজাল, মেয়াদোত্তীর্ণ ও গুণমানহীন ওষুধ।
চিকিৎসা সরঞ্জামের আবরণে জীবনরক্ষাকারী প্রতিষেধকের নামে বিষ ছড়িয়ে দেওয়ার এই চক্রান্ত এখন প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়মে রূপ নিয়েছে।
ক্ষমতার ছায়াতলে দুর্ধর্ষ সিন্ডিকেট
অভিযোগের প্রধান তির বাংলাদেশ কেমিস্টস অ্যান্ড ড্রাগিস্টস সমিতি (বিসিডিএস) চট্টগ্রাম শাখার সাবেক সভাপতি নুরুল গণি (আবদুল গণি চৌধুরী) এবং বিসিডিএস সদস্য শিবু প্রসাদের দিকে।
তাঁদের নেতৃত্বে ওয়াসিম, রাশেদ ও মইনুলসহ প্রায় ২০ জনের একটি শক্তিশালী চক্র এই অবৈধ সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করছে।
অভিযোগ রয়েছে, পেশাজীবী সংগঠন বিসিডিএসের ক্ষমতাকে ঢাল বানিয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও সাধারণ সভা (এজিএম) ব্যতিরেকে একতরফাভাবে ‘পকেট কমিটি’র মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তন সত্ত্বেও নিজেদের পরিচয় পুনর্গঠন করে ও প্রশাসনকে ফাঁকি দিয়ে লালদীঘিস্থ বিসিডিএস কার্যালয় জবরদখলের পাঁয়তারা চালাচ্ছে এই অসাধু বলয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাজারী লেনের এক ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, একটি মর্যাদাপূর্ণ সংগঠনকে ব্যক্তিগত ক্লাবে রূপান্তর করা হয়েছে।
বিসিডিএসের মতো পেশাজীবী সংগঠনের রাজনৈতিক প্রভাবকে ঢাল বানিয়ে তারা কায়েম করেছে ত্রাসের রাজত্ব।
অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বললেই মেলে প্রাণনাশের হুমকি। আমরা এই অবৈধ কমিটি এবং অসাধু সিন্ডিকেটের হাত থেকে সাধারণ ব্যবসায়ীদের মুক্তি চাই।
২৫ গোপন আস্তানা ও ‘শান্তি সার্জিক্যাল’ কাণ্ড
আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও ওষুধ প্রশাসনের নজর এড়াতে হাজারী লেনের গলিঘুঁজিতে গড়ে তোলা হয়েছে অর্ধশতাধিক গোপন গুদাম, যার মধ্যে অন্তত ২৫টি সরাসরি গণি-শিবু চক্রের নিয়ন্ত্রণে। এসব আস্তানায় বিপুল পরিমাণ অবৈধ, ক্ষতিকর ও কেমিক্যালযুক্ত ওষুধ মজুদ রাখা হয়।
গত ৪ জুলাই ২০২৬ তারিখে শিবু প্রসাদের মালিকানাধীন ‘শান্তি সার্জিক্যাল’ এ নকল স্ট্রিপ বিক্রির সময় তিনি সাধারণ ব্যবসায়ীদের হাতে নাতে ধরা পড়েন।
তবে কোনো আইনি পদক্ষেপ না নিয়ে মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের বিনিময়ে বিসিডিএস সভাপতি নুরুল গণি তাঁকে দায়মুক্তি দেন বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
হাজার কোটি টাকার সাম্রাজ্য ও জিম্মি ব্যবসায়ীরা
হাজারী লেনের প্রায় এক হাজার সাধারণ ওষুধ ব্যবসায়ী দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে এই সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি। অন্যায়ের প্রতিবাদ করলেই জোটে প্রাণনাশের হুমকি ও ভাড়াটে ক্যাডার বাহিনীর হামলা।
জানা যায়, শিবু প্রসাদ ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতা হত্যা মামলার একজন এজাহারভুক্ত পলাতক আসামি।
তা সত্ত্বেও ৫ আগস্ট-পরবর্তী পুনর্বাসিত কিছু অসাধু রাজনৈতিক কর্মীর মদদে তিনি বহাল তবিয়তে অবৈধ ব্যবসা ও ত্রাসের রাজত্ব চালিয়ে যাচ্ছেন।
মাঠপর্যায়ে তদারকির অভাব এবং প্রশাসনের একাংশের নীরবতার সুযোগে চক্রটি হাজার কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের মালিক বনে গেছে।
প্রশাসনের দ্বারে সংক্ষুব্ধ ব্যবসায়ী নেতারা
দীর্ঘদিনের জিম্মিদশা ও কার্যালয় জবরদখলের আশঙ্কায় অবশেষে সোচ্চার হয়েছেন হাজারী লেনের সাধারণ ব্যবসায়ীরা। সম্প্রতি সিন্ডিকেট ভাঙা, অবৈধ কমিটি বাতিল এবং অসাধু চক্রের দমনের দাবিতে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ।
অভিযোগপত্রে স্বাক্ষরকারী আট ব্যবসায়ী নেতা হলেন, আলমগীর নূর (নন্দন ফার্মা), আশীষ কুমার চৌধুরী (মেসার্স রোগমুক্তি ফার্মেসী), বিকাশ কান্তি সিংহ (মোহসেন আওলিয়া ফার্মেসী), দীলিপ কুমার সুশীল (অংকন মেডিকো), তপন বৈদ্য (ছবি মেডিকো), জয়নাল আবেদীন (আলিফ ড্রাগ হাউজ), শ্যামল চৌধুরী (অমিয় ফার্মেসী) ও মোঃ লোকমান হোসেন (ফার্স্ট এইড ফার্মেসী)।
সিএমপি কমিশনারের পাশাপাশি বিষয়টি অবহিত করে আশু হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, র্যাব-৭ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)।
জনস্বাস্থ্যে চরম হুমকি: জরুরি যা করণীয়
চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, ভুয়া ও ভেজাল ওষুধ গ্রহণের ফলে রোগীর শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স তৈরি হচ্ছে এবং কিডনি ও লিভার বিকল হয়ে হঠাৎ মৃত্যুর হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।
চিকিৎসা নিতে গিয়ে নাগরিক যখন প্রতিষেধকের নামে বিষ পান করেন, তখন রাষ্ট্রীয় তদারকি ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা শূন্যে ঠেকে।
সাধারণ ব্যবসায়ী ও সচেতন মহল অবিলম্বে কয়েকটি দাবি জানিয়ে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, পলাতক আসামি শিবু প্রসাদ ও তার সহযোগীদের দ্রুত গ্রেপ্তার। ‘শান্তি সার্জিক্যাল’ ও ‘শান্তি ফার্মেসী’সহ শিবুর মালিকানাধীন সব দোকান এবং গোপন ১৫-২০টি গোডাউন সিলগালা করা।
সেনাবাহিনী ও যৌথ বাহিনীর সমন্বয়ে হাজারী লেনে চিরুনি অভিযান পরিচালনা এবং অবৈধ বিসিডিএস কমিটি বিলুপ্ত করে সাধারণ ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, জনস্বাস্থ্য রক্ষায় নকল ও ভেজাল ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের বিরুদ্ধে এখনই ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চিহ্নিত গডফাদারদের দ্রুত গ্রেপ্তার, তাদের গোপন গোডাউনগুলোতে সেনাবাহিনী ও যৌথ বাহিনীর সমন্বিত অভিযান এবং অবৈধ কমিটি বিলুপ্ত না করা হলে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা পুরোপুরি ধসে পড়বে।
