বঙ্গোপসাগরের বুকে ভেসে এল রহস্যময় ‘দৈত্যকার’ ধাতব বস্তু: সন্দ্বীপে তোলপাড়!

প্রকাশিত: ২২ জুলাই, ২০২৬ ১২:৩৫

বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউয়ের মাঝে দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছিল লাল রঙের কোনো বিশালাকার বস্তু ভেসে আসছে। কাছে যেতেই জেলেদের চোখ চড়কগাছ!

দেখতে অবিকল তেলবাহী ট্রেনের ট্যাংকের মতো হলেও এটি মূলত একটি বিশাল আকৃতির প্রকাণ্ড ধাতব কাঠামো।

বঙ্গোপসাগরের সন্দ্বীপ চ্যানেল থেকে উদ্ধার করা সেই অজানা ‘রহস্যময়’ ধাতব কাঠামোটি ঘিরে এখন পুরো সন্দ্বীপজুড়ে চলছে তোলপাড় ও তীব্র জল্পনা-কল্পনা।

গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার সন্তোষপুর ইউনিয়নের বটগাছতলা ইলিশের ঘাটে বিশাল এই ধাতব কাঠামোটি টেনে নিয়ে আসেন স্থানীয় জেলেরা।

ঘটনার সূত্রপাত মঙ্গলবার দিনের জোয়ারে। সন্দ্বীপ চ্যানেলে অন্যান্য দিনের মতোই ট্রলার নিয়ে ইলিশ মাছ ধরতে যান স্থানীয় জেলেরা।

জাল ছড়ানোর প্রস্তুতি নেওয়ার সময় হঠাৎই জলের তোড়ে লাল রঙের একটি বিশালাকার অবয়ব ভেসে আসতে দেখেন তারা।

প্রথমে বস্তুটিকে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করতে না পারলেও কৌতূহলবশত কাছে যান জেলেরা। কাছে গিয়ে তারা দেখতে পান, এটি কোনো সাধারণ ভাসমান বর্জ্য নয়-বরং প্রায় ৩৫ ফুট দৈর্ঘ্য এবং ১০ ফুট ব্যাসের একটি প্রকাণ্ড লোহার কাঠামো!

ঘটনার বিবরণ দিয়ে উদ্ধারকারী দলটির অন্যতম জেলে যিশু জলদাস বলেন, আমরা তখন বোট থেকে সাগরে জাল ছাড়ছিলাম। দূর থেকে বুঝতে পারছিলাম না জিনিসটা কী। কাছে গিয়ে দেখি, পুরোনো একটা তেলের ট্যাংকারের মতো বস্তু।

পরে মোটা রশি দিয়ে বোটের সঙ্গে বেঁধে সেটি টানতে শুরু করি। বিশালাকার বস্তুটি একটি বোটের পক্ষে টানা সম্ভব হচ্ছিল না। পরে আরেকটি বোটের সাহায্যে সেটিকে ঘাটে নিয়ে এসেছি।

একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে ইছহাক নামের আরেক জেলে বলেন, সাগরে জিনিসটি ভাসতে দেখে কৌতূহল থেকে কাছে যাই।

পরে মনে হয়েছে, এটি বড় কোনো পুরোনো জাহাজের অংশ হবে। তারপর সবাই মিলে এটিকে তীরে নিয়ে এসেছি।

মঙ্গলবার রাতে কাঠামোটি ঘাটে পৌঁছানোর পর থেকেই পুরো এলাকায় খবরটি ছড়িয়ে পড়ে। রাতের অন্ধকারে এক নজর দেখার জন্য অনেকেই ঘাটে ছুটে যান। তবে আলো কম থাকায় বুধবার সকাল হতেই বটগাছতলা ইলিশের ঘাটে ভিড় জমায় হাজারো উৎসুক জনতা।

স্থানীয় হাট-বাজার এবং চায়ের দোকানের আড্ডায় এখন একটাই আলোচনা-সাগরের এই লাল কাঠামোটি আসলে কী?

কারো ধারণা, এটি সমুদ্রগামী কোনো বড় জাহাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া তেলের ট্যাংক, যার ভেতরে এখনো মূল্যবান মালামাল থাকতে পারে। আবার কারো মতে, এটি কোনো পরিত্যক্ত বাণিজ্যিক জাহাজের অংশ।

বুধবার সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, ঘাটের পাশেই একটি খালের খুঁটির সঙ্গে দড়ি দিয়ে শক্ত করে বেঁধে রাখা হয়েছে ৩৫ ফুট লম্বা সেই কাঠামোটি।

দীর্ঘদিন সাগরের নোনা জলে ভেসে থাকার স্পষ্ট ছাপ রয়েছে এর গায়ে-অনেক জায়গার লাল রং উঠে গিয়ে পড়েছে জং ও মরিচা। এক প্রান্তের বর্ধিত অংশে রয়েছে একটি বিশাল লোহার কড়া বা হুক।

ধাতব কাঠামোটির পরিচয় নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা মতামত:

জাহাজ ভাঙা শিল্পের অভিজ্ঞতা: সীতাকুণ্ডের কুমিরার এক অভিজ্ঞ জাহাজকাটা শ্রমিক সংবাদমাধ্যমকে জানান, এটি দেখে মনে হচ্ছে, সমুদ্রগামী জাহাজের বিশাল আকৃতির ক্রেনে ব্যবহৃত একটি স্তম্ভ। এ ধরনের স্তম্ভ জাহাজের ক্রেনের মূল কাঠামোর অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

বিআইডব্লিউটিএ-এর পর্যবেক্ষণ: বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) উপপরিচালক নয়ন শীল ছবি দেখে প্রাথমিক ধারণায় বলেন, এটি কোনো ড্রেজারের কাঠামো হতে পারে। বিআইডব্লিউটিএ এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে দেখা হচ্ছে এ ধরনের কোনো কাঠামো নিখোঁজ বা ভেসে গেছে কি না।

অক্লান্ত পরিশ্রমে বিশালাকার এই ধাতব বস্তুটি উদ্ধার করলেও জেলেদের মনে কোনো লোভ নেই। খাঁটি সততার পরিচয় দিয়ে উদ্ধারকারী জেলে যিশু জলদাস ও কৃপা জলদাস স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, এটা কার, কোথা থেকে এসেছে, আমরা কিছুই জানি না।

আমরা শুধু সাগরে ভাসতে দেখে তীরে এনেছি। প্রকৃত মালিক যদি উপযুক্ত প্রমাণ নিয়ে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, তবে এটি বুঝিয়ে দিতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই।

এ বিষয়ে সন্দ্বীপ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুজন হালদার জানান, সাগরে ভেসে আসা একটি খালি ও পুরোনো ধাতব কাঠামো সন্তোষপুরের ঘাটে এনে রাখার খবর তারা পেয়েছেন।

আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে যদি প্রকৃত মালিক দাবি নিয়ে আসেন, তবে পুলিশের পক্ষ থেকে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ ও হস্তান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হবে।