হলিউডের থ্রিলারকেও হার মানায়: কীভাবে ৭ ব্যাংক গিলে খেয়েছে এস আলম গ্রুপ?

প্রকাশিত: ২২ জুলাই, ২০২৬ ১৩:০৭

কোনো রুদ্ধশ্বাস রোমাঞ্চকর উপন্যাসের পটভূমি নয়, এটি বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের নিষ্ঠুরতম এক বাস্তবতার চিত্রচিত্র।

দীর্ঘ ১৫ বছরের রাজনৈতিক প্রভাব এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে কীভাবে একটি একক শিল্পগোষ্ঠী দেশের পুরো আর্থিক খাতকে জিম্মি করে ফেলতে পারে-তার এক নজিরবিহীন নজির গড়েছে ‘এস আলম গ্রুপ’।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ফিন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদনে ‘এস গ্রুপ’ ছদ্মনামে একটি কেস স্টাডি প্রকাশ করা হয়েছে।

দৈনিক প্রথম আলোর অনুসন্ধানে নিশ্চিত হওয়া গেছে, এই ‘এস গ্রুপ’ আর কেউ নয়-বিতর্কিত শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপ।

প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দেশের ব্যাংকিং খাতের ইতিহাসে এটি কেবল কোনো সাধারণ দুর্নীতি নয়, বরং এক পদ্ধতিগত প্রাতিষ্ঠানিক ধসের চূড়ান্ত উদাহরণ।

দখলের আড়ালে অদৃশ্য হাত: ৭ ব্যাংক ও ১ আর্থিক প্রতিষ্ঠান

বিএফআইইউর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এস আলম গ্রুপের জালিয়াতির প্রথম ধাপই ছিল প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিজেদের পকেটে পুরে নেওয়া।

রাজনৈতিক ক্ষমতার উচ্চপর্যায়ের সংযোগ এবং রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্যবহার করে তারা দেশের ৭টি বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং ১টি অসংগঠিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ জোরপূর্বক ছিনিয়ে নেয়।

নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পরপরই পরিচালনা পর্ষদে বসানো হয় পারিবারিক সদস্য ও অনুগত সহযোগীদের।

রাতারাতি বদলে ফেলা হয় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নীতি-নিয়ম। দেশের বৃহত্তম বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকটি সহ একাধিক প্রতিষ্ঠানে তৈরি করা হয় একচ্ছত্র আধিপত্য, যেখানে কোনো ধরনের তদারকি বা যাচাই-বাছাই ছাড়াই একের পর এক ঋণ অনুমোদনের পথ সুগম করা হয়।

ভুয়া কোম্পানির আড়ালে ২.২৫ লাখ কোটি টাকার মহোৎসব

ব্যাংকগুলোর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হাতে আসার পর শুরু হয় ‘ঋণ’ নামের আড়ালে অর্থ লুটপাটের উৎসব। বৈধ ব্যবসার পাশাপাশি খোলা হয় শত শত কাল্পনিক বা ভুয়া (শেল) কোম্পানি।

এক নজরে এস আলমের ঋণের হিসাব:

মোট উত্তোলিত অর্থ: ২,২৫,০০০ কোটি টাকা (সোয়া ২ লাখ কোটি)

৪৩টি সরাসরি প্রতিষ্ঠানের নামে: ৯০,০০০ কোটি টাকা

বেনামি/ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে: ৯৮,০০০ কোটি টাকা

অন্যান্য মাধ্যমে: ৩৭,০০০ কোটি টাকা

বন্ধকির অবিশ্বাস্য ভেল্কিবাজি:

নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে মঞ্জুর করা ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার বিপরীতে ব্যাংকে রাখা বন্ধকি সম্পদের (জামানত) বাজারমূল্য ছিল মাত্র ৩২ হাজার কোটি টাকা।

ঋণের বিশাল পরিমাণের তুলনায় জামানতের এই অভাবনীয় ব্যবধান দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার ঝুঁকি মূল্যায়ন ও অভ্যন্তরীণ নজরদারির চরম ব্যর্থতাকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে।

৪ দেশ, ৩টি পাসপোর্ট ও মানি লন্ডারিংয়ের জাল

ব্যাংক থেকে লুট করা এই বিপুল অর্থ অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও জটিল প্রক্রিয়ায় বিদেশে পাচার করা হয়েছে। অর্থ স্থানান্তরের জন্য এস আলম গ্রুপ মূলত বিভিন্ন ট্রাস্ট অ্যাকাউন্ট, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ওভার-ইনভয়েসিং এবং হুন্ডির মতো অনানুষ্ঠানিক মাধ্যম ব্যবহার করেছে।

বিএফআইইউ জানায়, এই পাচার করা অর্থ দিয়ে মূলত সিঙ্গাপুর-মালয়েশিয়া-সাইপ্রাস ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) চারটি দেশে সুবিশাল অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য গড়ে তোলা হয়েছে।

এছাড়াও, শিথিল তদারকির জন্য পরিচিত বিভিন্ন অফশোর অঞ্চলেও তাদের শক্তিশালী নেটওয়ার্কের সন্ধান মিলেছে।

সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, বিদেশের মাটিতে এই অবৈধ সম্পদ রক্ষায় এবং আইনি জটিলতা এড়াতে গ্রুপটির মূল কর্ণধাররা তিনটি ভিন্ন দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও প্রবাসী আয় সেবার আড়ালে তাদের বিদেশি উদ্যোগগুলো মূলত অবৈধ অর্থ পাচারের নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

নীরবতার আড়ালে অভিযুক্তরা

বিএফআইইউর প্রতিবেদনে উঠে আসা এই গুরুতর অভিযোগ ও অর্থ পাচারের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সম্প্রতি মূলধারার সংবাদমাধ্যম ‘প্রথম আলো’র পক্ষ থেকে ই-মেইলের মাধ্যমে এস আলম গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।

তবে একাধিক দিন পার হয়ে গেলেও প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য বা ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।

রাজনৈতিক শক্তি, গোয়েন্দা সংস্থার প্রভাব এবং ব্যাংকিং কাঠামোর চরম ব্যর্থতাকে কাজে লাগিয়ে যেভাবে দেশের বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়েছে, তা দেশের আর্থিক খাতের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে।