বিশেষ প্রতিবেদক:
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের নির্মম ও পুঞ্জীভূত অবহেলার বলি হয়েছেন খেটে খাওয়া নয়টি তাজা প্রাণ। ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডের বিষাক্ত গ্যাসের নিষ্ঠুর করাল গ্রাসে শ্রমিকদের এই মর্মান্তিক মৃত্যুর চারদিন পেরিয়ে গেলেও, কর্তৃপক্ষের অপরাধ ঢাকতে এবং দায় এড়ানোর এক অস্বস্তিকর ধোঁয়াশা লক্ষ্য করা গেছে। জীবনের ন্যূনতম নিরাপত্তাটুকু নিশ্চিত না করে মুনাফা অর্জনের এই অন্ধ দৌড় কেবল আইন লঙ্ঘনই নয়, এটি স্পষ্টতই এক পরিকল্পিত কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড।
অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার নির্মম চিত্র
আন্তর্জাতিক শ্রম আইন এবং কর্মক্ষেত্রের মৌলিক নিরাপত্তা নির্দেশিকাকে চরম বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পরিচালিত হচ্ছিল এই প্রতিষ্ঠানটি। জাহাজ কাটার পূর্বে বাধ্যতামূলক গ্যাস-মুক্তকরণ (Gas-freeing) প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করার মতো মারাত্মক অপরাধের কারণে জাহাজের অন্ধকার পেটগুলো পরিণত হয়েছিল একেকটি গ্যাসপ্রকোষ্ঠে।
-
তদন্তে চরম প্রতিকূলতা: বুয়েটের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ইয়াসীর আরাফাত খানের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত দল ঘটনাস্থলে গিয়েও বৈরী আবহাওয়া ও মারাত্মক বিষাক্ত গ্যাসের তীব্র ঝুঁকির কারণে মূল ঘটনাস্থলে প্রবেশ করতে পারেনি।
-
দায় এড়ানোর পাঁয়তারা: স্বজনদের শোকের সুযোগ নিয়ে এবং প্রাতিষ্ঠানিক চাপ এড়াতে নিহতের পরিবারগুলোকে বাদীর পরিবর্তে শেষ পর্যন্ত পুলিশ নিজেই দায়সারা গোছের একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করেছে, যা এই হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করার এক সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
বর্তমান সরকারের প্রতি ভূক্তভোগী ও এলাকাবাসীর দাবী:
বাংলাদেশের শ্রমবাজার ও শিল্প খাত আজ এক গভীর সংকটের মুখোমুখি। সামান্য কিছু মুনাফার লোভে মানুষের জীবনকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করার এই সংস্কৃতি আর চলতে দেওয়া যায় না। সীতাকুণ্ডের এই লোমহর্ষক ঘটনা কোনো সাধারণ দুর্ঘটনা নয়; এটি সম্পূর্ণভাবে কর্তৃপক্ষের অপরাধজনক অবহেলার ফল।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও শ্রম মানদণ্ডের আলোকে বর্তমান সরকারের প্রতি আমাদের জোরালো আহ্বান—
সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতকরণ: সীতাকুণ্ডের এই বর্বরোচিত ঘটনার সাথে জড়িত ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডের মালিকপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট দুর্নীতিগ্রস্ত পরিদর্শকদের গ্রেপ্তার করে দ্রুত ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক ও কঠোরতম শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
নিরাপত্তার আমূল সংস্কার: দেশের প্রতিটি শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা পর্যন্ত সকল ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কার্যক্রম অবিলম্বে স্থগিত রাখতে হবে।
শ্রমিকদের জীবনের মূল্যায়ন: নিহত প্রতিটি শ্রমিকের পরিবারকে আজীবন আয়ের সমপরিমাণ ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং আহত শ্রমিকদের উন্নত সুচিকিৎসা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় নিশ্চিত করতে হবে।
“শ্রমিকের রক্তে কেনা মুনাফার পাহাড় আমরা আর দেখতে চাই না। বিচারহীনতার এই দীর্ঘ সংস্কৃতি ভেঙে অপরাধীদের এমন কঠোর সাজা দেওয়া হোক, যা ভবিষ্যতের জন্য এক নজির হয়ে থাকে।”
