চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর পুনর্নিরীক্ষণের জন্য আবেদন পড়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার ৭০৬টি। মোট ৩৯ হাজার ৭৯৮ পরীক্ষার্থী এসব আবেদন করেছে।
বিষয়ভিত্তিক আবেদনের হিসাবে সবচেয়ে এগিয়ে ইংরেজি ও গণিত। শুধু এই দুই বিষয়েই পুনর্নিরীক্ষণের জন্য আবেদন পড়েছে ৩৪ হাজারের বেশি।
এর মধ্যে ইংরেজিতে ২০ হাজার ৪০০টি এবং গণিতে ১৩ হাজার ৮২৮টি আবেদন জমা পড়েছে। মোট আবেদনের ১৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ ইংরেজিতে এবং ১২ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ গণিতে।
এ দুই বিষয়ের ফল নিয়েই যে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ, আবেদনের পরিসংখ্যানেই তার স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের ফলাফল বিশ্লেষণেও মিলেছে একই চিত্র। ইংরেজি ও গণিতে অকৃতকার্য পরীক্ষার্থীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। ইংরেজি প্রথম ও দ্বিতীয় পত্র মিলিয়ে পরীক্ষা দিয়েছিল ১ লাখ ২৯ হাজার ৩৬৬ জন। এর মধ্যে পাস করেনি ৩৫ হাজার ৮৭৬ জন।
অন্যদিকে গণিতে পরীক্ষা দিয়েছে ১ লাখ ২৯ হাজার ২৩৫ জন, যার মধ্যে অকৃতকার্য হয়েছে ২৫ হাজার ৭৮৩ জন। অর্থাৎ এই দুই বিষয়েই অকৃতকার্য হয়েছে মোট ৬১ হাজার ৬৫৯ পরীক্ষার্থী।
১০ আগস্ট সারা দেশে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। এবার চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৫৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ।
২০১০ সালে সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতিতে পরীক্ষা চালুর পর এবারই এ বোর্ডে পাসের হার সর্বনিম্ন। এর আগে ২০০৭ সালে চট্টগ্রাম বোর্ডে পাসের হার ছিল ৫৭ দশমিক ৯৪ শতাংশ। সে হিসাবে ১৯ বছরের মধ্যে এবারই এ বোর্ডে পাসের হার সবচেয়ে কম।
ফল প্রকাশের পর পুনর্নিরীক্ষণের জন্য অনলাইনে ১১ থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত আবেদন নেওয়া হয়। এই সময়ের মধ্যেই ৩৯ হাজার ৭৯৮ পরীক্ষার্থী ১ লাখ ১৪ হাজার ৭০৬টি আবেদন করেছে।
ইংরেজি ও গণিতের পর বাংলায় সবচেয়ে বেশি আবেদন জমা পড়েছে। বাংলায় আবেদন হয়েছে ৭ হাজার ৭৭১টি।
এ ছাড়া পদার্থবিজ্ঞানে ৬ হাজার ৮২৩টি, জীববিজ্ঞানে ৪ হাজার ৫৫৯টি, রসায়নে ৪ হাজার ৫৩৫টি এবং উচ্চতর গণিতে ৪ হাজার ৪৪০টি আবেদন পড়েছে।
৫২ হাজার ৭৬৬ পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে চট্টগ্রামের পাশাপাশি কক্সবাজার, রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির শিক্ষার্থীরাও এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়।
এবার মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১ লাখ ৩০ হাজার ৬৮২ জন। এর মধ্যে পরীক্ষায় উপস্থিত ছিল ১ লাখ ৩০ হাজার ২১৯ জন।
ফলাফলে পাস করেছে ৭৭ হাজার ৪৫৩ জন। অর্থাৎ ৫২ হাজার ৭৬৬ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছে। এর মধ্যে এক বিষয়ে পাস করেনি-এমন পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ২৮ হাজার ৭৭১ জন।
শিক্ষা বোর্ডের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অকৃতকার্য পরীক্ষার্থীদের হার ইংরেজি ও গণিতে বেশি। আর ফল পুনর্নিরীক্ষণের আবেদনের ক্ষেত্রেও সবচেয়ে বেশি আগ্রহ দেখা গেছে এই দুই বিষয়েই।
এবারের পুনর্নিরীক্ষণ প্রক্রিয়ায় এসেছে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। এত দিন উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণের সময় মূলত প্রাপ্ত নম্বরের যোগ-বিয়োগে কোনো ভুল হয়েছে কি না, সেটিই যাচাই করা হতো।
উত্তরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কোনো ভুল হয়েছে কি না, তা দেখার সুযোগ ছিল না।
এবার সেই ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। পুনর্নিরীক্ষণের পাশাপাশি উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে মূল্যায়নে কোনো ভুল হয়েছে কি না, সেটিও যাচাই করা হবে।
এ কারণে প্রয়োজনীয় সংখ্যক পরীক্ষকও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে এ কাজের জন্য প্রায় ২৮৭ পরীক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে অধিকাংশই ইংরেজি ও গণিত বিষয়ের।
চট্টগ্রাম বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী বলেন, এত দিন পুনর্নিরীক্ষণের সময় উত্তরপত্রে প্রাপ্ত নম্বরের যোগ-বিয়োগে কোনো ভুল হয়েছে কি না, তা যাচাই করা হতো।
তবে উত্তরপত্র মূল্যায়নে ভুল হয়েছে কি না, তা দেখার সুযোগ ছিল না। এবার সে ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। এবার উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়ন করা হবে। এ জন্য প্রায় ২৮৭ পরীক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
ফল বদলের অপেক্ষায় হাজারো শিক্ষার্থী
প্রতিবছরই এসএসসি ও এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষার উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণের সময় নম্বর গণনায় ভুল ধরা পড়ে।
পরীক্ষার্থীদের আবেদনের ভিত্তিতে উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণের পর অনেকের ফল পরিবর্তনের ঘটনাও ঘটে। বিগত বছরগুলোতেও পুনর্নিরীক্ষণের পর পাস করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধির ঘটনা ঘটেছে।
এবার চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে ১ হাজার ২৬৮টি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। পাসের হার ৫৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ এবং অকৃতকার্য পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ৫২ হাজার ৭৬৬ জন হওয়ায় পুনর্নিরীক্ষণের ফল নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আগ্রহও তীব্র।
বিশেষ করে ইংরেজি ও গণিতে অকৃতকার্য পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় এ দুই বিষয়েই পুনর্নিরীক্ষণের আবেদনের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।
এবার উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ যুক্ত হওয়ায় ফল পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়েও পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে নতুন করে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
এখন অপেক্ষা পুনর্নিরীক্ষণের ফল প্রকাশের। সেখানে কতজনের ফল পরিবর্তন হয়, কতজন নতুন করে পাসের তালিকায় যুক্ত হয় এবং কোন কোন বিষয়ে মূল্যায়নের ভুল ধরা পড়ে-তা জানতে আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে হাজারো শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবার।
