গ্রাহকদের বন্ধক রাখা স্বর্ণালংকার ফেরত না দেওয়া এবং বিভিন্ন সমিতির ঋণের চাপের মধ্যে পরিবারসহ আত্মগোপনে যাওয়া চাঁদপুরের স্বর্ণ ব্যবসায়ী পিন্টু দাসকে অবশেষে আটক করেছে পুলিশ।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) ভোর পাঁচটার দিকে চট্টগ্রামের পটিয়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে স্ত্রী ও দুই সন্তানসহ তাকে আটক করে চাঁদপুর সদর মডেল থানা-পুলিশ।
চাঁদপুর সদর মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) কালামের নেতৃত্বে পুলিশের একটি বিশেষ দল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পটিয়া এলাকায় অভিযানটি পরিচালনা করে।
আরও পড়ুন
অভিযানে পিন্টু দাসের সঙ্গে তার স্ত্রী রিমি দাস এবং দুই ছেলে প্রিয়ম দাস ও রূপম দাসকেও আটক করা হয়।
প্রাথমিক আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাদের চাঁদপুরে নিয়ে আসার প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছে অভিযানকারী দল।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পিন্টু দাস চাঁদপুর শহরের কুমিল্লা সড়কের আখন্দ মার্কেটের নিচতলায় ‘এস কে শিল্পালয়’ নামে একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতেন।
সেখানে তিনি সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বাজারমূল্যের চেয়ে কম মূল্যে স্বর্ণালংকার বন্ধক রেখে নগদ অর্থ দিতেন।
অভিযোগ উঠেছে, গ্রাহকেরা বন্ধক রাখা স্বর্ণালংকারের বিপরীতে নেওয়া টাকা পরিশোধ করে অলংকার ফেরত চাইলে তিনি নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করতেন।
একপর্যায়ে পাওনা অর্থ পরিশোধের পরও অনেক গ্রাহক তাদের বন্ধক রাখা স্বর্ণালংকার ফেরত পাননি।
এরই মধ্যে বিভিন্ন সমিতি থেকে নেওয়া ঋণের চাপও বাড়তে থাকে। পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে পিন্টু দাস পরিবারসহ হঠাৎ এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যান বলে জানা গেছে।
তারপরই বিষয়টি ঘিরে এলাকায় নানা আলোচনা শুরু হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুরো পরিবার নিখোঁজ হয়েছে-এমন বিভ্রান্তিকর তথ্যও ছড়িয়ে পড়ে। তবে পুলিশের বক্তব্যে পরে সেই ‘নিখোঁজ’ হওয়ার বিষয়টি ভিন্ন মোড় নেয়।
এর আগে চাঁদপুর সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফয়েজ আহমেদ জানিয়েছিলেন, স্বর্ণ ব্যবসায়ী পিন্টু দাস নিখোঁজ হননি, বরং দেনার দায়ে আত্মগোপন করেছিলেন। পরিবারের পক্ষ থেকেও কোনো নিখোঁজ ডায়েরি করা হয়নি।
অন্যদিকে, ভুক্তভোগীদের অভিযোগের ভিত্তিতে বিষয়টি খতিয়ে দেখছিল পুলিশ। এরই ধারাবাহিকতায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে চট্টগ্রামের পটিয়ায় অভিযান চালিয়ে পরিবারসহ পিন্টু দাসকে আটক করা হয়।
ভুক্তভোগীদের একজন রঘুনাথপুরের বাসিন্দা রাসেল খান। তার অভিযোগ, তিনি আড়াই ভরি স্বর্ণালংকার বন্ধক রেখে পিন্টু দাসের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন।
পরে পাওনা টাকা পরিশোধ করে নিজের স্বর্ণালংকার ফেরত নিতে গেলে পিন্টু দাস নানা টালবাহানা করতে থাকেন।
একপর্যায়ে রাতের আঁধারে বাসা ছেড়ে পরিবারসহ পিন্টু দাস পালিয়ে যান বলে অভিযোগ করেন রাসেল খান। পরে প্রতিকার চেয়ে গত ২৪ আগস্ট চাঁদপুর সদর মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন তিনি।
শুধু রাসেল খান নন, আরও কয়েকজন গ্রাহক স্বর্ণালংকার ফেরত না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন।
জাহিদুল ইসলাম নামের এক গ্রাহক ১২ আনা এবং শুভঙ্কর মজুমদার ১০ আনা স্বর্ণালংকার ফেরত না পাওয়ার বিষয়ে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রাহকদের অভিযোগ, বন্ধক রাখা স্বর্ণালংকার ফেরত না দেওয়া এবং বিভিন্ন ঋণের বিষয়সহ পুরো ঘটনাটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা ও আর্থিক লেনদেনের প্রকৃত চিত্র তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হবে।
পটিয়ায় স্ত্রী ও দুই সন্তানসহ পিন্টু দাসকে আটকের পর এখন তাদের চাঁদপুরে ফিরিয়ে আনার প্রস্তুতি চলছে। প্রাথমিক আইনি প্রক্রিয়া শেষে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
একদিকে গ্রাহকদের বন্ধক রাখা স্বর্ণ ফেরত না পাওয়ার অভিযোগ, অন্যদিকে দেনার চাপে ব্যবসায়ী ও তার পরিবারের আত্মগোপন-সব মিলিয়ে ঘটনাটি ইতোমধ্যে চাঁদপুরজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এখন তদন্তের মাধ্যমে সামনে আসার অপেক্ষায় রয়েছে এই স্বর্ণ ব্যবসায়ীর আর্থিক লেনদেন ও গ্রাহকদের অভিযোগের বিস্তারিত চিত্র।
