‘কাট্টলীর মঞ্জু’র ৪৩ লাখ টাকার প্রোটন, সম্পদের পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন, অনুসন্ধানের তাগিদ

প্রকাশিত: ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৫:০৮

চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মঞ্জুর আলম মঞ্জু। দলীয় রাজনীতিতে তিনি ‘কাট্টলীর মঞ্জু’ নামে পরিচিত। ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত এই নেতা সম্প্রতি ৪৩ লাখ টাকা মূল্যের প্রোটন এক্স৭০ মডেলের একটি এসইউভি গাড়িতে চলাফেরা করছেন।

গাড়িটির মালিকানা, কীভাবে সেটি তাঁর হাতে এলো এবং তাঁর সম্পদের পরিবর্তনের উৎস-এসব নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে।

তবে গণমাধ্যমের কাছে মঞ্জুর আলমের দাবি, গাড়িটি তাঁর নিজের কেনা নয়। এক ব্যবসায়ীর কাছে পাওনা ১০ লাখ টাকা পরিশোধ না করায় ২০২২ সালের দিকে তিনি গাড়িটি নিয়ে নেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রাম নগরীর উত্তর কাট্টলী এলাকার বাসিন্দা মঞ্জুর আলম মঞ্জু বিএনপির দুই প্রভাবশালী নেতা-বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আসলাম চৌধুরীর সঙ্গে রাজনীতি করেন। মহানগর বিএনপির মধ্যম সারির এই নেতা একই সঙ্গে ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।

গত ১ সেপ্টেম্বর বিকেলে চট্টগ্রাম নগরীর পুরাতন রেলওয়ে স্টেশন চত্বরে মহানগর বিএনপির সমাবেশে ধূসর রঙের প্রোটন এক্স৭০ এসইউভিতে করে হাজির হন মঞ্জুর আলম। গাড়িটির নিবন্ধন নম্বর চট্ট মেট্রো-ঘ ১১-৫৩২৬। সে সময় তাঁর সঙ্গে অন্য কোনো নেতাকর্মী ছিলেন না।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মঞ্জুর আলম গাড়ি থেকে নেমে প্রথমে গায়ের হাফহাতা শার্ট পরিবর্তন করে গেঞ্জি পরেন। পরে তিনি সমাবেশের মঞ্চের দিকে চলে যান।

গাড়ির মালিক কে?

৪৩ লাখ টাকা মূল্যের এই প্রোটন গাড়িটি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে মঞ্জুর আলম সংবাদকর্মীকে বলেন, এই প্রোটন গাড়িটা আমার না, সীতাকুণ্ডের শীতলপুরের সোহেল রানা নামের এক ব্যবসায়ীর। তার কাছে আমি ১০ লাখ পেতাম। সে টাকা দিতে না পারায় ২০২২ সালের দিকে তার গাড়িটা আমি নিয়ে ফেলি।

অর্থাৎ মঞ্জুর নিজের বক্তব্য অনুযায়ী, গাড়িটির বর্তমান ব্যবহার তাঁর হাতে এলেও এর পেছনে প্রচলিত অর্থে গাড়ি কেনার লেনদেন ছিল না, বরং একজন ব্যবসায়ীর কাছে তাঁর পাওনা অর্থের বিপরীতে গাড়িটি নেওয়ার দাবি করেছেন তিনি।

কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়-১০ লাখ টাকা পাওনার বিপরীতে তখন প্রায় ৪৩ লাখ টাকা বাজারমূল্যের একটি গাড়ি কীভাবে তাঁর হাতে এলো, গাড়িটির আইনগত মালিকানা কার, এবং এ বিষয়ে কোনো লিখিত সমঝোতা বা লেনদেনের নথি আছে কি না? এসব প্রশ্নের পূর্ণ উত্তর মেলেনি।

‘তেলের গাড়ি’, তাই পড়ে ছিল

মঞ্জুর আলমের দাবি, গত কয়েক বছর তাঁকে এই গাড়িতে নিয়মিত চলাফেরা করতে দেখা যায়নি কারণ গাড়িটি তিনি ব্যবহার করতেন না। তাঁর ভাষায়, তখন তিনি গাড়িটা ব্যবহার করেননি। তেলের গাড়ি বিধায় এটা বাসায় ফেলে রেখেছিলেন।

তিনি গণমাধ্যমে আরও বলেন, ওই সময় তিনি নিশান ব্র্যান্ডের একটি জিপ গাড়ি ব্যবহার করতেন এবং সেটি পিএইচপি গ্রুপ তাঁকে উপহার দিয়েছিল। গাড়ি ব্যবহারের ইতিহাস প্রসঙ্গে মঞ্জুর আলম বলেন, এর আগে আমি ১৯৯৭ সালে প্রথম টয়োটা এলিয়ন কার কিনেছি।

নিজের বক্তব্য অনুযায়ী, ১৯৯৭ সাল থেকেই তিনি ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করে আসছেন। একই সঙ্গে তিনি নিজেকে ব্যবসায়ী হিসেবেও পরিচয় দিয়েছেন।

নিজের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্নের জবাবে মঞ্জুর আলম তাঁর সমসাময়িক নেতাদের প্রসঙ্গও টানেন। তিনি বলেন, আমাদের যেসব নেতা আগে লক্কর-ঝক্কর গাড়ি চালাতেন, তাদের এখন দুই-তিনটা গাড়ি আছে। তবে আমি যখন গাড়ি চালাই, যারা এখন বিএনপির বড় বড় নেতা হয়েছেন, তারা তখন গাড়ি চালায়নি। তখন তারা সিএনজি অটোরিকশায় চলাফেরা করতেন।

রাজনৈতিক নেতাদের আর্থিক অবস্থানের পরিবর্তন এবং সেই পরিবর্তনের সঙ্গে ব্যবসা, সম্পদ ও ক্ষমতার সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন এখন দলীয় অঙ্গনেও আলোচনার বিষয়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রোটন গাড়িটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী সোহেল রানা সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারিতে মেসার্স নাহার এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী। প্রতিষ্ঠানটি স্ক্র্যাপ জাহাজের মালামাল বেচাকেনার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।

গাড়িটির বিষয়ে জানতে চাইলে সোহেল রানা গণমাধ্যমকে বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে তিনি (মঞ্জুর আলম) আমার কাছ থেকে প্রোটন গাড়িটি নিয়ে ফেলেন। তবে আমাদের মধ্যে কী লেনদেন আছে তা আপনাকে বলতে চাই না।

মঞ্জু বলেছেন, তিনি ২০২২ সালের দিকে গাড়িটি নিয়েছেন, অন্যদিকে সোহেল রানা বলেছেন-২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে গাড়িটি তাঁর কাছ থেকে নেওয়া হয়। এই সময়ের পার্থক্যও নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

তৎকালীন সময়ে প্রোটন এক্স৭০ মডেলের গাড়িটির বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৪৩ লাখ টাকা। মালয়েশিয়ার গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান প্রোটনের এই মডেল বাংলাদেশে পিএইচপি অটোমোবাইলসের মাধ্যমে বাজারজাত/উৎপাদিত হয়েছিল।

মঞ্জুর আলমের নিজের বক্তব্য অনুযায়ী ১৯৯৭ সাল থেকে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার, ব্যবসা পরিচালনা, পৈতৃক সম্পত্তির ওপর কয়েক বছর আগে নির্মিত পাঁচতলা বাড়ি এবং পূর্বে ব্যবহৃত নিশান জিপ-এসব সম্পদের উৎস ও মালিকানা সম্পর্কেও তথ্য-নির্ভর অনুসন্ধান প্রয়োজন।

মঞ্জুর আলমের বিষয়ে নগর বিএনপির নেতাকর্মীদের একাংশের প্রশ্ন মূলত তাঁর সম্পদের বৈধতা নিয়ে সরাসরি কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে-এমন নয়, বরং রাজনৈতিক অবস্থান ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি তাঁর দৃশ্যমান জীবনযাত্রার পরিবর্তন নিয়েও কৌতূহল তৈরি হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে নগরীর আকবর শাহ এলাকার এক যুবদল নেতা বলেন, বিএনপি সরকার গঠনের পর মঞ্জুর আলমকে আমরা বিলাসবহুল গাড়িতে চলাফেরা করতে দেখছি। মাত্র ছয় মাসের মধ্যে তিনি হুট করে কী এমন পেয়ে গেলেন? অথচ দল ক্ষমতায় আসার পরও তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মী দুঃখ-কষ্টে জীবনযাপন করছেন।

তবে এই বক্তব্যের বিপরীতে মঞ্জুর আলমের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর দাবি, তাঁর গাড়ি ব্যবহার বা সম্পদের বিষয়টি নতুন নয় এবং তিনি দীর্ঘদিন ধরে গাড়ি ব্যবহার করছেন ও ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।

এদিকে চট্টগ্রাম নগর বিএনপির একজন যুগ্ম আহ্বায়ক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমীর খসরু ও আসলাম চৌধুরীর মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব থাকলেও মঞ্জুর আলম অত্যন্ত কৌশলে দুই নেতার সাথে ভারসাম্য রক্ষা করে চলেন।

বিষয়টি নিয়ে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব নাজিমুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, আওয়ামী লীগের ১৬ বছরের শাসনামলে বিএনপির নেতাকর্মীরা স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেননি। অনেকে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারেননি।

ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিএনপির নেতাকর্মীরা ব্যবসা-বাণিজ্য করে হয়তো এখন কিছুটা স্বাচ্ছন্দবোধ করছেন। তবে কোনো নেতা যদি ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে অনৈতিক কাজ করেন তাতে দল ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হবে। সূত্র-আরএস

সংশ্লিষ্ট বিএনপি নেতৃত্ব চাইলে গাড়ির মালিকানা, লেনদেনের কাগজপত্র, আয়-ব্যয়ের তথ্য এবং ব্যবসায়িক সম্পদের উৎস যাচাই করে বিষয়টির একটি স্বচ্ছ নিষ্পত্তি করতে পারে।

এতে অভিযোগ সত্য হলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার পথ যেমন খুলবে, তেমনি অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে মঞ্জুর আলমের ভাবমূর্তিও প্রশ্নমুক্ত হবে।