চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করে মহাখালী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে বদলি করা হয়েছে।
তাঁর স্থলে কুমিল্লার বরুড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ সাজেদুর রহমানকে চট্টগ্রামের নতুন সিভিল সার্জন হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের পার-২ শাখা থেকে গতকাল বুধবার (১৯ আগস্ট) জারি করা প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়। যুগ্মসচিব সাইফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত ওই আদেশে বলা হয়েছে, জনস্বার্থে এ বদলি করা হয়েছে।
ডা. জাহাঙ্গীর আলমকে সরিয়ে দেওয়ার এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এলো, যখন তাঁর দায়িত্বপালনকালে চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয় ঘিরে একাধিক অভিযোগ ও বিতর্ক সামনে এসেছে।
বিশেষ করে স্বাস্থ্য সহকারীসহ ১৭১টি পদে নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলো এখনো পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়েছে কি না, তা নিয়েও রয়েছে আলোচনা।
১৭১ পদে নিয়োগ, প্রশ্নের শুরু সেখানেই
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ডা. জাহাঙ্গীর আলমকে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন হিসেবে পদায়ন করা হয়। তাঁর দায়িত্বকালে সিভিল সার্জন কার্যালয়ের অধীনে স্বাস্থ্য সহকারীসহ ১৭১টি পদে নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।
কিন্তু পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরই প্রক্রিয়াটি নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন সামনে আসে। পরীক্ষার্থীদের একটি অংশ সময়মতো এসএমএস না পাওয়ার অভিযোগ করেন।
ওএমআর শিট পূরণ নিয়েও বিভ্রান্তির কথা ওঠে। সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন তৈরি হয় ফল প্রকাশের সময় নিয়ে—পরীক্ষা শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ফল প্রকাশ করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে।
একটি নিয়োগ পরীক্ষার ক্ষেত্রে পরীক্ষার্থীদের কাছে তথ্য পৌঁছানো, উত্তরপত্র পূরণের নির্দেশনা এবং ফল প্রস্তুত ও প্রকাশের প্রক্রিয়া-প্রতিটি ধাপই গুরুত্বপূর্ণ।
ফলে এত অল্প সময়ে ফল প্রকাশ কীভাবে হলো, পুরো প্রক্রিয়ায় কী ধরনের যাচাই-বাছাই করা হয়েছিল এবং অভিযোগগুলো কর্তৃপক্ষ কীভাবে নিষ্পত্তি করেছিল-এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো গুরুত্বপূর্ণ।
ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক সমালোচনা হয়।
তবে অভিযোগগুলো নিয়ে স্বাধীন তদন্তে পুরো নিয়োগপ্রক্রিয়ার নথি, পরীক্ষার ব্যবস্থাপনা, ওএমআর প্রক্রিয়াকরণ, ফল প্রস্তুত এবং প্রকাশের সময়সূচি যাচাই করা প্রয়োজন।
সিভিল সার্জনের নাম ব্যবহার করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ
বিতর্ক শুধু নিয়োগ পরীক্ষাতেই থামেনি। এর আগে সিভিল সার্জন কার্যালয়ের এক কর্মচারীর বিরুদ্ধে সিভিল সার্জনের নাম ব্যবহার করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ ওঠে।
অভিযোগটি জানাজানি হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে কার্যালয়ের ভেতরে আপস-মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এখানেই প্রশ্নটি আরও গুরুতর হয়ে ওঠে-কোনো সরকারি কর্মকর্তার নাম ব্যবহার করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠলে সেটির আনুষ্ঠানিক তদন্ত হয়েছিল কি না, হয়ে থাকলে তার ফল কী, এবং অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল?
সরকারি প্রতিষ্ঠানে এমন অভিযোগের ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ সমঝোতার বদলে নথিভিত্তিক তদন্ত ও জবাবদিহির প্রয়োজনীয়তাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ অভিযোগটি সত্য হলে তা শুধু একজন কর্মচারীর অনিয়মের বিষয় নয়; সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির প্রশ্নও সামনে আসে।
ক্লিনিক-হাসপাতালের লাইসেন্সেও অভিযোগ
চট্টগ্রামের বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিক, হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্স প্রদান ও নবায়ন নিয়েও সিভিল সার্জন কার্যালয়ের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগ রয়েছে।
লাইসেন্স দেওয়া বা নবায়নের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো, জনবল, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও অন্যান্য শর্ত পূরণ করা হয়েছে কি না-এসব যাচাইয়ের বিষয়। ফলে এ খাতে ওঠা অভিযোগগুলোও কেবল প্রশাসনিক অসন্তোষ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করতে হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্সের নথি, পরিদর্শন প্রতিবেদন, নবায়নের সুপারিশ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করা জরুরি।
বিশেষ করে একই দপ্তরকে ঘিরে নিয়োগ পরীক্ষা, অর্থ আদায়ের অভিযোগ এবং বেসরকারি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স সংক্রান্ত প্রশ্ন সামনে এলে সামগ্রিক প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হয়।
বদলির আদেশে নতুন অধ্যায়
এর মধ্যেই ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীকে ওএসডি করে মহাখালী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে বদলি করা হলো। তাঁর স্থলে ডা. মোহাম্মদ সাজেদুর রহমানকে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে বদলি করা কর্মকর্তাদের আগামী ২৪ আগস্টের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যোগদান না করলে ২৫ আগস্ট থেকে বর্তমান কর্মস্থল থেকেই তাঁদের তাৎক্ষণিকভাবে অবমুক্ত (স্ট্যান্ড রিলিজ) বলে গণ্য করা হবে।
ফলে এখন চট্টগ্রামের স্বাস্থ্য প্রশাসনে নতুন দায়িত্ব শুরু করতে যাচ্ছেন ডা. সাজেদুর রহমান।
তবে বদলির আদেশের মধ্যেই বিতর্কের অবসান হয় না। বরং সামনে আসে আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন-চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয় ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর কোনোটি কি আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত করা হবে? ১৭১ পদে নিয়োগ পরীক্ষার পুরো প্রক্রিয়া কি পুনরায় যাচাই হবে? সিভিল সার্জনের নাম ব্যবহার করে অর্থ আদায়ের অভিযোগের নেপথ্যে কী ছিল? আর বেসরকারি ক্লিনিক, হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্স প্রদান ও নবায়ন নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলোর নথিভিত্তিক পর্যালোচনা হবে কি?
জাহাঙ্গীর আলমের বদলি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণের জন্য প্রয়োজন আলাদা তদন্ত।
চট্টগ্রামের স্বাস্থ্য প্রশাসনের ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনতে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে-বদলি নয়, অভিযোগগুলোর স্বচ্ছ নিষ্পত্তি।
