মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার, পোকামাকড়, পোড়া তেল, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ; উৎসব সুপার শপে অনিবন্ধিত শিশুখাদ্য ও খাদ্য সম্পূরক বিক্রির অভিযোগ: পোকাযুক্ত বাদাম, নোংরা ড্রেন আর তিন মাসের জেল
চট্টগ্রাম নগরে ভোক্তার টেবিলে পৌঁছানোর আগেই খাবারের নিরাপত্তা নিয়ে একের পর এক গুরুতর প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে চারটি খাদ্য প্রতিষ্ঠান। কোথাও নিম্নমানের ঘি দিয়ে বেকারি পণ্য তৈরির অভিযোগ, কোথাও ম্যাংগো পাল্পের ড্রামে পোকামাকড়, আবার কোথাও মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার সংরক্ষণ ও বিক্রির পাশাপাশি আমদানিকৃত পণ্যে প্রয়োজনীয় তথ্য না থাকার বিষয়টি ধরা পড়েছে।
সব মিলিয়ে চার প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে ৪০ লাখ টাকা জরিমানা করেছে বিশুদ্ধ খাদ্য আদালত। রোববার (২৩ আগস্ট) বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ এ তথ্য জানিয়েছে।
আরও পড়ুন
বিশুদ্ধ খাদ্য আদালত, চট্টগ্রাম মহানগরের মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মোস্তফার নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে সবচেয়ে বড় অঙ্কের জরিমানা হয়েছে ফ্লেভারস সুইটস অ্যান্ড বেকারির কারখানায়।
প্রতিষ্ঠানটিকে ১৯ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। মেরিডিয়ান ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেড ও উৎসব সুপার শপকে ১০ লাখ টাকা করে এবং রিও ক্যাফে-মাজায়দারকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
এই অভিযানের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক শুধু জরিমানার অঙ্ক নয়; পরিদর্শনে উঠে আসা অনিয়মগুলোর ধরন। কারণ এসব অভিযোগের একটি অংশ সরাসরি খাদ্যের মান ও সংরক্ষণব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত, আর অন্য অংশ ভোক্তার কাছে পণ্যের পরিচয় ও নিরাপত্তা সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার প্রশ্ন তুলেছে।
উৎসব সুপার শপে প্রশ্নের পর প্রশ্ন
চার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে উৎসব সুপার শপের বিরুদ্ধে পাওয়া অভিযোগগুলোর ধরন বিশেষভাবে নজর কাড়ে। আদালত সূত্রে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটিতে মেয়াদোত্তীর্ণ মোমোস, নষ্ট মরিচ, মসলা ও চকোলেট সংরক্ষণ ও বিক্রির প্রমাণ পাওয়া যায়। একই সঙ্গে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে মাংস সংরক্ষণ এবং একই সরঞ্জামে গরু ও খাসির মাংস প্রক্রিয়াকরণের বিষয়ও ধরা পড়ে।
শুধু খাদ্য সংরক্ষণ নয়, পণ্যের তথ্য প্রদানের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। আমদানিকৃত পণ্যে যথাযথ লেভেলিং ছিল না, কিছু পণ্যে আমদানিকারকের তথ্য পাওয়া যায়নি। এর পাশাপাশি নিবন্ধনবিহীন শিশুখাদ্য ও অনুমতিবিহীন খাদ্য সম্পূরক বিক্রির অভিযোগও উঠে এসেছে।
আরও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে পণ্যের পুষ্টিতথ্য নিয়ে করা কারসাজির অভিযোগ। আদালত সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু পণ্যের পুষ্টিতথ্য ঢেকে নিজস্ব স্টিকার ব্যবহার করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় নিবন্ধন ছাড়াই আচার ও ঘরোয়া পণ্য বিক্রির প্রমাণও পাওয়া গেছে।
এসব অনিয়মের জন্য উৎসব সুপার শপকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। অনাদায়ে তিন মাসের কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
একটি সুপার শপের ক্ষেত্রে ভোক্তা সাধারণত পণ্যের মান, লেবেল ও সংরক্ষণব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখেন।
সেই জায়গাতেই যদি মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার, লেবেলিং ঘাটতি, নিবন্ধনহীন পণ্য এবং পুষ্টিতথ্য ঢেকে দেওয়ার মতো অভিযোগ ওঠে, তাহলে বিষয়টি কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের জরিমানায় শেষ হওয়ার নয়—ভোক্তা সুরক্ষা ও খাদ্য নজরদারির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়।
বেকারি কারখানায় যা মিলল
ফ্লেভারস সুইটস অ্যান্ড বেকারির কারখানায় পাওয়া অনিয়মের তালিকাটিও দীর্ঘ। আদালত সূত্রে জানা গেছে, নিম্নমানের ঘি ব্যবহার করে বেকারি পণ্য উৎপাদন, পচা-বাসি মিষ্টির উচ্ছিষ্ট সংরক্ষণ ও ব্যবহার এবং মেয়াদোত্তীর্ণ মিষ্টি, কেক ও বিস্কুট সংরক্ষণের প্রমাণ পাওয়া যায়।
খাদ্যপণ্যের যথাযথ লেভেলিং না থাকা এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে উৎপাদনের পাশাপাশি ভাঙা টাইলস ও নোংরা ড্রেনেজের বিষয়ও উঠে এসেছে।
সবচেয়ে অস্বস্তিকর বিষয়গুলোর একটি ছিল দই জাক দেওয়ার কাজে নোংরা কম্বল ব্যবহারের অভিযোগ। এর সঙ্গে ছিল পোকাযুক্ত বাদাম, অপরিচ্ছন্ন সরঞ্জামে খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ এবং ফ্রিজারে মেয়াদহীন খাবার সংরক্ষণের মতো অনিয়ম।
এসব অপরাধে প্রতিষ্ঠানটিকে ১৯ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানার অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে তিন মাসের কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
মেরিডিয়ানে পোকামাকড় ও পোড়া তেলের অভিযোগ
মেরিডিয়ান ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেডে বিভিন্ন চিপস, নুডলস ও ম্যাংগো বারের মান নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার অভিযোগ পাওয়া যায়। আদালত সূত্রে আরও জানা গেছে, উৎপাদন এলাকায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের পাশাপাশি তেলাপোকার বিচরণও দেখা গেছে।
ম্যাংগো পাল্প সংরক্ষণের ড্রামে পোকামাকড়ের উপস্থিতি, ভাঙা ও তৈলাক্ত মেঝে এবং পোড়া তেল ব্যবহারের মতো বিষয়ও অভিযানে ধরা পড়ে।
প্রতিষ্ঠানটিকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। অনাদায়ে তিন মাসের কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
রিও ক্যাফেতেও ছাড় নেই
রিও ক্যাফে-মাজায়দারে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ও বিক্রি, পচা-বাসি খাবার সংরক্ষণ এবং কর্মীদের স্বাস্থ্যবিধি না মানার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে আদালত সূত্র।
প্রতিষ্ঠানটি প্রয়োজনীয় নিবন্ধন ও সনদ ছাড়াই ব্যবসা পরিচালনা করছিল বলেও অভিযানে উঠে এসেছে। এসব কারণে প্রতিষ্ঠানটিকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানার অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে ১০ দিনের কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
শুধু জরিমানা নয়, নজরদারিও চলবে
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের মেট্রোপলিটন নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফারহান ইসলাম বলেন, অভিযানে জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বেশ কিছু গুরুতর অনিয়ম পাওয়া গেছে। নিরাপদ খাদ্য আইন অনুযায়ী আদালত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছেন।
তিনি বলেন, খাদ্য ব্যবসায়ীদের মানসম্মত ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্য উৎপাদন ও বিক্রির বিষয়ে আরও সতর্ক হতে হবে। জনস্বার্থে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে। যেসব প্রতিষ্ঠানকে মানোন্নয়নের জন্য সময় দেওয়া হয়েছে, পরবর্তী সময়ে তাদের কার্যক্রমও পর্যবেক্ষণ করা হবে।
তবে আদালতের পদক্ষেপ এখানেই শেষ হচ্ছে না। ফ্লেভারস সুইটস অ্যান্ড বেকারিকে ২২ সেপ্টেম্বর, মেরিডিয়ান ফুড প্রোডাক্টসকে ৬ সেপ্টেম্বর এবং উৎসব সুপার শপকে ৩০ আগস্ট আদালতে সশরীরে উপস্থিত হয়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ফলে চার প্রতিষ্ঠানে ৪০ লাখ টাকার জরিমানা কেবল তাৎক্ষণিক শাস্তির হিসাব নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরবর্তী নজরদারি ও আদালতে জবাবদিহির প্রক্রিয়াও।
অভিযানে উঠে আসা অভিযোগগুলো শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে মোকাবিলা করে, নির্ধারিত সময়ে কী প্রতিবেদন দেয় এবং পরবর্তী পরিদর্শনে তাদের খাদ্য নিরাপত্তাব্যবস্থায় বাস্তব পরিবর্তন আসে কি না-এখন নজর থাকবে সেদিকেই।
