কর্ণফুলীর দক্ষিণ তীরে লালদিয়ার চর। চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান ব্যস্ত টার্মিনালগুলোর কিছুটা ভাটিতে, সাগর মোহনার কাছাকাছি এই চরকে ঘিরেই এবার শুরু হল নতুন এক সম্ভাবনার অধ্যায়।
বিদেশি বিনিয়োগে নির্মিত হতে যাওয়া চট্টগ্রাম বন্দরের প্রথম গ্রিনফিল্ড কনটেইনার টার্মিনালের নির্মাণকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে রোববার।
প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগে নির্মিতব্য এই টার্মিনালকে ঘিরে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা, দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য এবং ভবিষ্যৎ লজিস্টিক হাব হিসেবে চট্টগ্রামের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, আজ নতুন অধ্যায়। কারণ বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও টার্মিনাল হ্যান্ডলিংয়ের নতুন যুগে প্রবেশ করতে চলেছি। পিপিপিতে অনেক বড় বিনিয়োগ।
প্রতি বছর ৮ লাখ টিইইউএস কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করতে সক্ষম হব। সঙ্গে অনেক আধুনিক সুবিধা থাকবে। বাংলাদেশে বিনিয়োগের প্রতি আন্তর্জাতিক আস্থা প্রতিষ্ঠার সূচনা আজ হতে চলেছে।
বিদেশি বিনিয়োগে হতে যাওয়া চট্টগ্রাম বন্দরের প্রথম টার্মিনালটি সম্পর্কে তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরকে আধুনিক করার এ অগ্রযাত্রা শুরু হচ্ছে। আরো অনেকের আগ্রহ আছে। দেশের স্বার্থ প্রাধান্য দিয়ে আলোচনা চলছে।
লালদিয়া আধুনিক টার্মিনাল কীভাবে পরিচালনা করতে হয়, সেটার পথও আমাদের দেখাবে। এটি বাস্তবায়নে যত সহযোগিতা প্রয়োজন তা আমাদের মন্ত্রণালয় থেকে করা হবে।
চট্টগ্রামের হৃদয় বন্দর, লক্ষ্য আঞ্চলিক লজিস্টিক হাব
অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, চট্টগ্রামবাসীর হৃদয় হল বন্দর। এখানে সকল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্দর ঘিরেই হয়। আমাদের আছে একটি নির্বাচিত সরকার।
২০৩৪ সালে ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য আছে সরকারের; হয়ত কিছুটা উচ্চাভিলাষী। কিন্তু দীর্ঘামেয়াদে আমাদের উচ্চাভিলাষী হতেই হবে।
অর্থনীতি মূলত বেসরকারি খাতের মাধ্যমে পরিচালিত হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারের কাজ হলো তাদের সহযোগিতা করা। আমাদের লক্ষ্য অর্জন করতে হলে সবচেয়ে ভালো ব্যবসা নীতি, বিনিয়োগ নীতি ও লজিস্টিক সাপোর্ট থাকতে হবে।
চট্টগ্রামকে লজিস্টিক্যাল হাবে পরিণত করা আমাদের লক্ষ্য, শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, এই অঞ্চলের জন্য। তাই চট্টগ্রাম বন্দরের সম্ভাবনাকে পুরোদমে কাজে লাগাতে হবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, আশা করি, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই টার্মিনালের কাজ শেষ হবে। আমরা সরকারের পক্ষ থেকে সব রকম সহযোগিতা করতে প্রস্তুত আছি। বিশ্বের জন্য আমরা দ্বার উন্মুক্ত করতে চাই। শুধু লজিস্টিক হাব হিসেবে নয়, সবরকম বিনিয়োগের জন্য।
এটার সাথে আরো কয়টি পোর্ট করতে যাচ্ছি। চট্টগ্রামে আরো কয়টি ইকোনমিক জোন হবে। চট্টগ্রামের মানুষের যে প্রত্যাশা, বাংলাদেশের মানুষের যে প্রত্যাশা চট্টগ্রাম বাণিজ্যিক রাজধানী হবে।
বাণিজ্যিক রাজধানী কেউ করে না, বাণিজ্যিক রাজধানী হয়। এসমস্ত কাজের মাধ্যমে যখন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়বে, সেটাই হবে বাণিজ্যিক রাজধানী।
ডেনমার্কের মেয়ার্স্ক গ্রুপের কোম্পানি নির্মাণ করবে টার্মিনাল
কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরে লালদিয়ার চরে টার্মিনাল নির্মাণের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গত ১৭ নভেম্বর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে চুক্তি সই করে ডেনমার্কের মেয়ার্স্ক গ্রুপের কোম্পানি এপিএম টার্মিনালস।
চুক্তির শর্ত অনুসারে চলতি বছরের ২২ এপ্রিল চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে এপিএম টার্মিনালসকে প্রকল্পের জন্য জমি হস্তান্তর করে।
নির্মাণ সময় ৩ বছর ধরে হওয়া কনসেশন চুক্তির আওতায় প্রতিষ্ঠানটি টার্মিনাল চালু হওয়ার পর তা ৩০ বছর পরিচালনা করবে। আর চুক্তির শর্ত পূরণ ও পালন করলে এই মেয়াদ আরো ১৫ বছর বাড়বে। সব মিলে টার্মিনালটি তাদের হাতে থাকতে পারে ৪৮ বছর।
বাংলাদেশে ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলার বলেন, ডেনমার্ক বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক অংশীদার। বাংলাদেশের অগ্রগতিতে একসাথে কাজ করতে আমরা সবসময় আগ্রহী।
“লালদিয়া টার্মিনালের মাধ্যমে বাংলাদেশ এই বার্তা দিচ্ছে যে, বাংলাদেশ বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত।
এপিএম টার্মিনালসের সিইও রমেশ ডেভিড বলেন, এটি অনেক প্রথমের একটি প্রকল্প। প্রথম পিপিপি, প্রথম সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ এবং প্রথম গ্রিনফিল্ড টার্মিনাল। এখানে আমরা নতুন ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করব।
২৪ ঘণ্টা সচল থাকবে, ভিড়বে বড় জাহাজ
চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান বলেন, দেশের আমদানি-রপ্তানির ৯৫ শতাংশ হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। বিশ্বব্যাপী বন্দর ব্যবস্থাপনা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণ না করলে আমরা পিছিয়ে যাব। বন্দর ব্যবহারকারীদের সময়োপযোগী সেবা দিতে আমাদের আধুনিক ও গ্রিন প্রযুক্তি গ্রহণ করতে হচ্ছে।
এপিএম টার্মিনালস আন্তর্জাতিক মানের বন্দর ব্যবস্থাপনায় অত্যন্ত অভিজ্ঞ। তিন বছরের মধ্যে আপনারা লালদিয়াতে এর প্রতিফলন দেখবেন। এটিই ২৪/৭ সচল প্রথম টার্মিনাল হতে চলেছে। আমাদের বর্তমান সক্ষমতার চেয়ে দ্বিগুণ কনটেইনার ধারণ ক্ষমতার জাহাজ ভিড়বে লালদিয়া টার্মিনালে।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব জাকারিয়া এবং এপিএম টার্মিনালসের গ্লোবাল হেড অব অপারেশনস জ্যাক ক্রেগ।
নতুন টার্মিনালের নির্মাণকাজ শেষ হলে সেখানে সাড়ে ১০ মিটার ড্রাফটের এবং ৬ হাজার টিইইউএস ধারণক্ষমতার জাহাজ ভিড়তে পারবে।
বন্দর ব্যবহারকারী ও ব্যবসায়ীরাও টার্মিনাল নির্মাণকে ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, এতে বন্দরের সক্ষমতা বাড়বে, দ্রুত ও কম খরচে পণ্য খালাসের সুযোগ তৈরি হবে এবং বড় আকারের কন্টেইনার জাহাজ চলাচলের পথ আরও সুগম হবে।
চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান টার্মিনালগুলো থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার ভাটিতে, কর্ণফুলী নদীর মোহনার কাছাকাছি এবং নদীর গুপ্তবাঁকের আগেই লালদিয়ার চরের অবস্থান।
চরের পর গুপ্তবাঁক পেরিয়ে রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরের পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল বা পিসিটি। টার্মিনালটি পরিচালনা করছে সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল বা আরএসজিটি।
এরপর আরও উজানে রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরের তিনটি টার্মিনাল-নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বা এনসিটি, চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনাল বা সিসিটি এবং জেনারেল কার্গো বার্থ বা জিসিবি।
বর্তমানে সাগর মোহনা থেকে কর্ণফুলী নদীতে প্রবেশের পর নদীর একাধিক বাঁক পেরিয়ে এসব টার্মিনালে জাহাজ ভেড়াতে হয়। তবে সব টার্মিনালের মধ্যে মোহনার সবচেয়ে কাছে অবস্থান নির্মাণাধীন লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের।
ফলে নদীতে কোনো বাঁক পেরোনো ছাড়াই সবচেয়ে কম সময়ে, দ্রুত গতিতে এবং তুলনামূলক বড় আকারের জাহাজ ভিড়তে পারবে এখানে।
লালদিয়া টার্মিনালের মূল টার্মিনাল অংশ হবে ৩২ একর জায়গাজুড়ে। এর সঙ্গে থাকবে ৭ দশমিক ১৫ একরের কন্টেইনার ইয়ার্ড এবং ১০ একরের ট্রাক পার্কিং ও প্রি-গেট সুবিধা। সব মিলিয়ে পুরো টার্মিনালটির আয়তন হবে ৪৯ দশমিক ১৫ একর।
এর আগে চট্টগ্রাম বন্দরের যতগুলো টার্মিনাল নির্মাণ হয়েছে, সেগুলোতে প্রথমে বন্দর কর্তৃপক্ষ অবকাঠামো নির্মাণ করেছে। পরে বন্দর নিজে অথবা দেশি-বিদেশি অপারেটরদের মাধ্যমে পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু লালদিয়া টার্মিনাল ভিন্ন এক মডেলে নির্মিত হচ্ছে।
এটিকে বলা হচ্ছে বন্দরের প্রথম ‘গ্রিনফিল্ড টার্মিনাল’। অর্থাৎ খালি জমি থেকে পূর্ণাঙ্গ আধুনিক টার্মিনালে রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ করবে বিদেশি বিনিয়োগকারী।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই টার্মিনালের ৬১৬ মিটার দীর্ঘ জেটিতে বছরে ৮ লাখ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা সম্ভব হবে।
প্রকল্পটি বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ সরকারি-বেসরকারি অংশীদারি বা পিপিপি বিনিয়োগ। এতে মোট ৫৫০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ হবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
পিপিপি মডেলে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই অবকাঠামোগত উন্নয়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার ও ডেনমার্ক সরকারের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল ২০০১ সালের জুনে।
এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে মায়ের্স্ক গ্রুপের কোম্পানি এপিএম টার্মিনালস ২০২৩ সালের ২১ মে লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণের প্রস্তাব দেয়।
প্রস্তাবটি পিপিপি পদ্ধতিতে বাস্তবায়নের জন্য অর্থনৈতিক বিষয়ক মন্ত্রিসভা কমিটি নীতিগত অনুমোদন দেয় ২০২৩ সালের ২৯ নভেম্বর।
পরের বছরের ৩ জানুয়ারি বাংলাদেশ-ডেনমার্ক পিপিপি জয়েন্ট প্লাটফর্মের সভায় প্রকল্পটি উপস্থাপন করা হলে ডেনমার্ক সরকারের পক্ষে এপিএম টার্মিনালস প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য গ্রহণ করে।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই লালদিয়ার চরে বসতি স্থাপনকারীদের উচ্ছেদ করা হয়।
এরপর অন্তর্বর্তী সরকার প্রকল্পটি এগিয়ে নেয়। তাদের মেয়াদের শেষদিকে চুক্তি সই হয়। আর এখন মাঠপর্যায়ে শুরু হল সম্পূর্ণ বিদেশি বিনিয়োগে দেশের প্রথম গ্রিনফিল্ড টার্মিনালের নির্মাণকাজ।
লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণকে ঘিরে যেমন ব্যবসায়ী ও বন্দর ব্যবহারকারীদের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তেমনি রয়েছে উদ্বেগ ও বিতর্কও।
বন্দর রক্ষার দাবিতে আন্দোলনকারীরা মনে করেন, বন্দরে একের পর এক টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়া হলে ভবিষ্যতে বন্দর ব্যবস্থাপনায় সরকারি নিয়ন্ত্রণ কমে যেতে পারে।
তাদের আশঙ্কা, দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব জাতীয় অর্থনীতি এবং দেশের কৌশলগত সক্ষমতার ওপর পড়তে পারে। জনস্বার্থে এ ধরনের চুক্তি পুনর্বিবেচনার দাবিও তুলেছেন তারা।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ, আধুনিক প্রযুক্তি এবং দক্ষ বন্দর ব্যবস্থাপনার সমন্বয় ছাড়া বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকা কঠিন।
এখন তাই কর্ণফুলীর তীরে শুরু হওয়া লালদিয়ার এই নির্মাণযজ্ঞ শুধু একটি নতুন কনটেইনার টার্মিনাল তৈরির কাজ নয়, এটি চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো, দেশের বাণিজ্যিক ভবিষ্যৎ এবং বাংলাদেশকে আঞ্চলিক লজিস্টিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার এক বড় পরীক্ষাও।
আগামী তিন বছরে সেই পরীক্ষার ফল দৃশ্যমান হওয়ার কথা। আর কর্ণফুলীর মোহনার কাছে আজ যে নির্মাণকাজ শুরু হল, সেটিই হয়তো ভবিষ্যতের চট্টগ্রাম বন্দরের নতুন পরিচয়ের ভিত্তি হয়ে উঠবে।
