প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমবারের মতো চট্টগ্রাম সফরে যাচ্ছেন বিএনপির চেয়ারপারসন তারেক রহমান।
আগামী রবিবার (৯ আগস্ট) একদিনের সফরে কক্সবাজারের মহেশখালী থেকে চট্টগ্রামের বাঁশখালী, ফটিকছড়ি ও হাটহাজারী ঘুরে সন্ধ্যায় নগরীতে দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে সাংগঠনিক সভায় অংশ নেবেন তিনি।
ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সফরসূচি চূড়ান্ত করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে প্রশাসনের পাশাপাশি বিএনপি ও অঙ্গ-সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যেও ব্যাপক প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।
তৃণমূলের সঙ্গে সরাসরি কথা বলবেন প্রধানমন্ত্রী
তারেক রহমানের চট্টগ্রাম সফরের অন্যতম আকর্ষণীয় কর্মসূচি হচ্ছে দলীয় সাংগঠনিক সভা। বিএনপির সিনিয়র নেতৃবৃন্দ জানিয়েছেন, চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা-এই তিন সাংগঠনিক ইউনিটের বিএনপি এবং ১১টি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের পূর্ণাঙ্গ কমিটির সদস্যদের নিয়ে এ সভার আয়োজন করা হয়েছে।
সাংগঠনিক সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলবেন এবং তাদের বক্তব্য শুনবেন। একই সঙ্গে দল ও দেশের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনাও দেবেন তিনি।
দলের চেয়ারপারসন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এ উদ্যোগকে ব্যতিক্রমী হিসেবে দেখছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা। দীর্ঘদিন পর দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগ পেয়ে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস তৈরি হয়েছে।
সকালেই মহেশখালীতে পৌঁছাবেন
চূড়ান্ত সফরসূচি অনুযায়ী, ৯ আগস্ট সকাল ৯টায় মহেশখালীতে পৌঁছাবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সেখানে তিনি মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প এবং মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (মিডা) কার্যক্রম পরিদর্শন করবেন।
এরপর দুপুর ১২টায় হেলিকপ্টারযোগে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার বাহারছড়া সমুদ্র সৈকত সংলগ্ন এলাকায় যাবেন তিনি।
সেখানে সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে ত্রাণ বিতরণ করবেন প্রধানমন্ত্রী।
একই অনুষ্ঠানে বন্যায় গৃহহারা ১০০ পরিবারের হাতে নতুন বাড়ির চাবি তুলে দেওয়ার কথা রয়েছে।
ফটিকছড়িতে বাবুনগরীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ
বাঁশখালীর কর্মসূচি শেষে দুপুর ১টায় ফটিকছড়ি যাবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় গিয়ে হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন তিনি।
এরপর হাটহাজারী উপজেলার আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম মাদ্রাসায় গিয়ে মরহুম আল্লামা শাহ আহমদ শফি’র কবর জিয়ারত করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
পরে জেলা পরিষদ ডাকবাংলোয় সংক্ষিপ্ত বিরতি শেষে হাটহাজারী সরকারি কলেজ মাঠে সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন তিনি।
৩০ পরিবারকে এক লাখ টাকা করে অনুদান
হাটহাজারীতে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ৩০টি পরিবারকে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও ভূমি প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের পক্ষ থেকে ঘর নির্মাণের সহায়তা হিসেবে প্রতি পরিবারকে ১ লাখ টাকা করে অনুদান দেবেন প্রধানমন্ত্রী।
এ ছাড়া ১৫ জন প্রতিবন্ধীকে শুভেচ্ছা উপহার হিসেবে প্রত্যেককে ১০ হাজার টাকা করে আর্থিক অনুদান তুলে দেবেন তিনি।
সন্ধ্যায় রেডিসন ব্লুতে বিএনপির সাংগঠনিক সভা
দিনভর বিভিন্ন কর্মসূচি শেষে সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম নগরীর পাঁচ তারকা হোটেল রেডিসন ব্লুতে চট্টগ্রাম বিএনপির সাংগঠনিক সভায় যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
রাত ৯টা ২০ মিনিটে চট্টগ্রাম ত্যাগ করে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে তার।
‘দেশ ও মানুষের কল্যাণের কথাই ভাবছেন প্রধানমন্ত্রী’
প্রধানমন্ত্রীর সফরসূচি সম্পর্কে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী-বায়েজিদ আংশিক) আসনের সংসদ সদস্য এবং ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রতিটি মুহূর্তে দেশ ও মানুষের কল্যাণের কথা ভাবছেন।
তিনি বলেন, দেশের সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশা কীভাবে লাঘব করা যায় এবং রাষ্ট্রকে কীভাবে আরও বেশি জনগণের কল্যাণে সক্রিয় রাখা যায়-সেই চিন্তাই করছেন প্রধানমন্ত্রী।
ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, এ কারণেই চট্টগ্রাম অঞ্চলে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষজনকে দ্রুত পুনর্বাসন এবং ভেঙে যাওয়া বাড়িঘর নতুন করে নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি নিজেও বন্যার সময় দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে সরেজমিনে গিয়ে ত্রাণ ও পুনর্বাসনের কাজ করেছেন এবং বন্যার পর দ্রুত ক্ষতিগ্রস্তদের ঘরবাড়ি নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছেন।
তিনি জানান, সরকারের পক্ষ থেকে বাঁশখালীতে ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হচ্ছে। অন্যান্য উপজেলাতেও প্রয়োজন অনুযায়ী আর্থিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
‘তৃণমূলই দলের প্রাণ’
দলের সাংগঠনিক সভার বিষয়ে ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, আমাদের দলের চেয়ারপারসন তারেক রহমান সব সময় দলের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করেন। তিনি মনে করেন, তারাই দলের প্রাণ।
তিনি বলেন, এবার চট্টগ্রামের তিনটি সাংগঠনিক ইউনিট-মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ-বিএনপি, ১১টি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে নেতাকর্মীরাও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলবেন।
এটা তারেক রহমানের রাজনৈতিক দর্শন। এটাকে ধারণ করেই তিনি দেশ ও দলকে এগিয়ে নিতে চান, বলেন তিনি।
সভায় থাকবেন পদধারী নেতারা, আমন্ত্রণ পাবেন সিনিয়ররাও
চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও আমাদের দলের চেয়ারপারসন তারেক রহমান চট্টগ্রামের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সাংগঠনিক সভা করবেন বলে আমাদের জানানো হয়েছে।
সভায় কারা অংশ নেবেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, একটা ক্রাইটেরিয়া (যোগ্যতা) নির্ধারণ করা হয়েছে। সে অনুযায়ী বিএনপি ও অঙ্গ-সংগঠনের পদে থাকা নেতারা অংশ নেবেন।
তবে পদে নেই এমন কিছু সিনিয়র নেতৃবৃন্দ, যারা দীর্ঘদিন দলের দায়িত্ব পালন করেছেন, তাদেরও সভায় আমন্ত্রণ জানানো হবে বলে জানান তিনি।
বাঁশখালীতে জনসভা নয়, তবুও মানুষের ঢল নামার প্রত্যাশা
প্রধানমন্ত্রীর বাঁশখালীর কর্মসূচি নিয়ে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব লায়ন হেলাল উদ্দীন বলেন, প্রধানমন্ত্রী বাঁশখালীতে ত্রাণ বিতরণ এবং বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের নতুন বাড়ির চাবি হস্তান্তর করবেন।
তিনি জানান, সেখানে কোনো জনসভা হবে না। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ব্যাপক জনপ্রিয়তার কারণে তাকে এক নজর দেখার জন্য হাজার হাজার মানুষ সেখানে উপস্থিত হতে পারেন-এ বিষয়টি মাথায় রেখে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে দলীয়ভাবে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
নির্বিঘ্ন সফরে প্রশাসনের সমন্বিত প্রস্তুতি
প্রধানমন্ত্রীর সফরকে ঘিরে সার্বিক প্রস্তুতি সম্পর্কে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শরীফ উদ্দিন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফর নির্বিঘ্ন ও সুন্দরভাবে সম্পন্ন করতে জেলা প্রশাসনের পুরো টিম কাজ করছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা সমন্বিতভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তারেক রহমানের প্রথম চট্টগ্রাম সফরকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনের পাশাপাশি প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের মধ্যেও তৈরি হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ।
উন্নয়ন প্রকল্প পরিদর্শন, বন্যার্তদের পুনর্বাসন, ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ এবং সবশেষে তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে সরাসরি সাংগঠনিক সভা-ব্যস্ত একদিনের এই সফরে চট্টগ্রামের জন্য কী বার্তা দেন প্রধানমন্ত্রী, এখন সেদিকেই নজর বৃহত্তর চট্টগ্রামের।
