ডারউইনের বাইশ গজে আজ শুধু একটি টেস্ট ম্যাচের ফল নির্ধারিত হয়নি-লেখা হয়েছে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে যে জয়কে একসময় কেবল স্বপ্ন বলেই মনে হতো, সেই স্বপ্নই এবার বাস্তবের রূপ পেল।
টেস্ট ক্রিকেটে টানা চারদিন দাপট দেখিয়ে শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়াকে তাদেরই মাটিতে হারিয়ে ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ।
টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে থাকা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে র্যাঙ্কিংয়ের ৯ নম্বর দল বাংলাদেশের এই জয় তাই শুধু একটি ম্যাচের জয় নয়, এটি আত্মবিশ্বাস, সামর্থ্য ও দীর্ঘ অপেক্ষার এক অসাধারণ প্রতিফলন।
অস্ট্রেলিয়ার জন্য এই ফল নিঃসন্দেহে হজম করা কঠিন। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য এটি এমন এক অর্জন, যা বহুদিন ধরে ক্রিকেটপ্রেমীদের স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট জয় এমনিতেই কঠিন। তার ওপর তাদের প্রস্তুতি এবং চারজন বোলারের প্রত্যেকের ৩০০-এর বেশি টেস্ট উইকেটের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিলে বাংলাদেশের সাফল্যের মাহাত্ম্য আরও বেড়ে যায়।
ডারউইন এখন বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে। টেস্ট ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হলো। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে একটি টেস্ট জয়ের জন্য ২৩ বছরের অপেক্ষা অবশেষে সার্থক হলো। সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল বাংলাদেশ।
২৩ বছর আগে ডারউইন ও কেয়ার্নসে অস্ট্রেলিয়ার কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করেছিল বাংলাদেশ। দুই দশকেরও বেশি সময় পর দ্বিতীয়বারের মতো অস্ট্রেলিয়া সফরে এসে তাই প্রত্যাশার জায়গাটাও ছিল বাস্তববাদী-লড়াইটা যেন অন্তত জমে ওঠে।
কিন্তু ১৩ আগস্ট ম্যাচের প্রথম দিনেই সেই হিসাব বদলে দেন বাংলাদেশের পেসাররা। শুরু থেকেই এমন আগ্রাসী বোলিং দেখা গেল, যেন ডারউইনের বাইশ গজে লাল-সবুজের নতুন কোনো গল্প লেখা শুরু হয়েছে।
দুই সেশনেরও বেশি সময় ধরে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপের ওপর চলল বাংলাদেশের বোলারদের দাপট। দুইশ রানের আগেই অলআউট অস্ট্রেলিয়া! মুহূর্তটি যেন বিশ্বাস করার মতোই ছিল না।
বাংলাদেশের বোলাররা যখন অস্ট্রেলিয়াকে চাপে ফেললেন, তখন অনেকেই হয়তো ভেবেছিলেন-মিচেল স্টার্ক, প্যাট কামিন্স ও জশ হ্যাজলউডের মতো বিশ্বমানের বোলিং আক্রমণ এবার পাল্টা জবাব দেবে। কিন্তু গল্পটা সেদিন অন্যরকম ছিল।
শুধু বোলিং নয়, ব্যাট হাতেও অস্ট্রেলিয়াকে চমকে দেয় বাংলাদেশ। তানজিদ হাসান তামিম তুলে নেন ঐতিহাসিক সেঞ্চুরি। তাঁর সঙ্গে নাজমুল হোসেন শান্ত ও মেহেদী হাসান মিরাজের গুরুত্বপূর্ণ হাফ সেঞ্চুরি বাংলাদেশের ইনিংসকে এনে দেয় শক্ত ভিত।
এই তিন ব্যাটারের অনবদ্য ব্যাটিংয়ের সঙ্গে টেল এন্ডারদের উল্লেখযোগ্য অবদান যোগ হয়ে বাংলাদেশের লিড দাঁড়ায় ২২৮ রানে।
বিদেশের মাটিতে প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের এর চেয়ে বড় লিড আগে কখনও ছিল না। সেই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, ডারউইনের ম্যাচে বাংলাদেশ কতটা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল।
২২৮ রানের বিশাল ঘাটতি নিয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটারদের ওপর শুরু থেকেই ছিল চাপ। বাংলাদেশও সেই চাপ কমতে দেয়নি।
হাসান শুরুতেই জোড়া আঘাত করে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং অর্ডারে ধাক্কা দেন। প্রথম ইনিংসে স্টিভ স্মিথ এবং দ্বিতীয় ইনিংসে ক্যামেরন গ্রিন অস্ট্রেলিয়ার হয়ে কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
গ্রিন দেশের মাটিতে নিজের প্রথম সেঞ্চুরি তুলে নিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে লিড এনে দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু বাংলাদেশের সামনে তখনও ছিল আরেকটি বড় অস্ত্র-মেহেদী হাসান মিরাজ।
বল হাতে মিরাজ দেখালেন তাঁর ঘূর্ণির জাদু। অস্ট্রেলিয়ার লিড বড় হতে দিলেন না তিনি। ফলে বাংলাদেশের সামনে জয়ের জন্য লক্ষ্যও থাকল নাগালের মধ্যেই।
জয়ের জন্য বাংলাদেশের সামনে লক্ষ্য দাঁড়াল মাত্র ৫৭ রান।
প্রথম ইনিংসে সেঞ্চুরি করা তানজিদ হাসান তামিম এবার অবশ্য ব্যর্থ-ফিরলেন ডাক মেরে। তাতে অবশ্য বাংলাদেশের জয়ের পথে কোনো বড় বাধা তৈরি হয়নি।
সাদমান ইসলাম ও মুমিনুল হক ঠান্ডা মাথায় বাকি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করলেন। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচে বাংলাদেশকে মাত্র ৫৪ রানে অলআউট করার যে স্মৃতি অজিদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছিল, শেষ পর্যন্ত সেটিই যেন হয়ে রইল এক নিষ্ঠুর অতীতের স্মৃতি।
৫৭ রানের লক্ষ্য অনায়াসে পেরিয়ে গেল বাংলাদেশ। আর সেই মুহূর্তেই ডারউইনের আকাশে উঠল লাল-সবুজের বিজয়ের পতাকা।
২৩ বছর আগে যে ডারউইনে বাংলাদেশ অসহায় আত্মসমর্পণ করেছিল, ২৩ বছর পর সেই ডারউইনেই তারা অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে লিখল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক গল্প।
এটি বাংলাদেশের ক্রিকেটের আত্মবিশ্বাসের জয়, দীর্ঘ অপেক্ষার জয়, নিজেদের সামর্থ্যের ওপর বিশ্বাস রাখার জয়। ডারউইনের বাইশ গজে আজ তাই অস্ট্রেলিয়ার পরাজয়ের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের উত্থান।
ইতিহাসের পাতায় নতুন করে লেখা হলো-বাংলাদেশ পারে। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতেও পারে।
