লোহাগাড়া প্রতিনিধি : সড়কটির নাম দরবেশহাট-ডিসি সড়ক। নামের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথের পরিচয় থাকলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। কোথাও পিচ উঠে গেছে, কোথাও তৈরি হয়েছে বড় বড় গর্ত। সামান্য বৃষ্টি হলেই এসব গর্তে জমছে পানি। তখন বোঝার উপায় থাকে না-এটি সড়ক, নাকি পরিত্যক্ত কোনো জলাশয়।
চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার এই জনগুরুত্বপূর্ণ সড়কের পুটিবিলা হাজির রাস্তায় এমনই একটি বিশাল গর্তে জমে থাকা পানিতে ধানের চারা রোপণ করে অভিনব প্রতিবাদ জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
তাদের বক্তব্য, বছরের পর বছর সড়কের এমন দুরবস্থা চলতে থাকলে এটি আর রাস্তা থাকে না; ধান চাষের জমিতে পরিণত হয়।
দরবেশহাট থেকে হাসনা ভিটা পর্যন্ত সড়কের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখা যায়, একের পর এক গর্ত ও খানাখন্দ। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে উঠে গেছে পিচ।
কোথাও গর্ত এতটাই বড় যে যানবাহনকে গতি কমিয়ে পার হতে হচ্ছে। ঝুঁকি এড়াতে কোনো কোনো যাত্রী গাড়ি থেকে নেমে হেঁটে পথ পার হচ্ছেন।
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন শিক্ষার্থী, নারী, বৃদ্ধ ও রোগীরা। সড়কে জমে থাকা কাদা-পানির ছিটায় স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসাগামী শিক্ষার্থীদের পোশাক নষ্ট হচ্ছে। জরুরি প্রয়োজনে রোগী পরিবহনও হয়ে পড়েছে কঠিন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রত্যন্ত এলাকা থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় প্রসূতি রোগী আনার সময়ও পথের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছে যায়। কখনো কখনো পথেই প্রসবের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে বলে তাদের অভিযোগ।
সড়কটির দুরবস্থার আরেকটি দিক উঠে এসেছে যানবাহন চালকদের কথায়। সিএনজি চালক জিয়াউর রহমান বলেন, এই সড়কে গাড়ি চালানো ‘মশকিল’। একবার যাতায়াতের পরই নট-বল্টু ঢিলে হয়ে যায়। ফলে গাড়ি গ্যারেজে নিতে হচ্ছে। তাঁর দাবি, দ্রুত সড়কটি সংস্কার করা জরুরি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সড়কটির কার্যকর সংস্কার না হওয়ায় পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপ হয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে অতিরিক্ত ওজনের ভারী যানবাহনের চাপ।
প্রতিদিন গাছ, বাঁশ ও বালুভর্তি শত শত ট্রাক এই সড়ক দিয়ে চলাচল করে বলে তারা জানান। ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি পণ্য নিয়ে যান চলাচলের কারণে সড়কের ক্ষতি আরও বাড়ছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
বর্ষায় সমস্যাটি আরও প্রকট হয়। সামান্য বৃষ্টিতেই সড়কের বিভিন্ন অংশ পানিতে তলিয়ে যায়। পানি, কাদা ও বড় গর্ত একসঙ্গে মিলে তখন সড়কটি হয়ে ওঠে ঝুঁকিপূর্ণ। ধীরগতিতে যান চলাচলের কারণে সময়ও বাড়ে, বাড়ে দুর্ঘটনা ও যান্ত্রিক ক্ষতির আশঙ্কা।
অন্যদিকে, এই সড়ক স্থানীয় মানুষের যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। ফলে সড়কের দুরবস্থার প্রভাব শুধু যানবাহনে সীমাবদ্ধ থাকছে না, শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ দৈনন্দিন জীবনেও এর প্রভাব পড়ছে।
ক্ষোভের এই বাস্তবতাই এবার প্রকাশ পেয়েছে প্রতীকী প্রতিবাদে। পুটিবিলা হাজির রাস্তায় বিশাল গর্তে জমে থাকা পানিতে এলাকাবাসীর ধানের চারা রোপণ যেন একটি প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে-যে জায়গা দিয়ে মানুষের চলাচল করার কথা, সেখানে যদি ধান ফলানোর মতো পানি জমে থাকে, তাহলে সেটিকে আর কত দিন সড়ক বলা যাবে?
আবদুর রশিদ সওদাগর বলেন, ডিসি সড়কটি খুবই জনগুরুত্বপূর্ণ। আমরা সবসময় এই সড়ক দিয়ে যোগাযোগ করি। আমার দোকানের সামনে হাজির রাস্তায় বিশাল গর্তে এলাকাবাসীরা ধান রোপণ করে প্রতিবাদ করেছে।
স্কুলপড়ুয়া এক শিক্ষার্থীও জানিয়েছে তার ভোগান্তির কথা। তার ভাষায়, সড়কটি দিয়ে স্কুলে যাওয়া যাচ্ছে না। শুধু গর্ত আর গর্ত; স্কুলের পোশাকও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
পুটিবিলা ইউপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. ইকবাল বলেন, সড়কটি দিয়ে চলাচল করা খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। এলাকার মানুষ প্রতিনিয়ত হিমশিম খাচ্ছেন। সড়কের বড় বড় গর্তের বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনকে অবগত করেছেন বলেও জানান তিনি।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগের বিপরীতে আশার কথা শুনিয়েছেন সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী। উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী কাজি ফাহাদ বিন মাহমুদ বলেন, সড়কটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বর্তমানে এর অবস্থা খুবই নাজুক। সড়কটি মেরামতের জন্য ইউএনও মহোদয় তাদের নির্দেশনা দিয়েছেন। দ্রুত কাজ শুরু করা হবে বলেও জানান তিনি।
এখন প্রশ্ন একটাই-সেই ‘দ্রুত’ সময়টি কখন?
কারণ, সড়কের গর্তগুলো শুধু ইট-পাথর ও পিচের ক্ষয় নয়, প্রতিদিন এর মধ্য দিয়ে চলাচল করছেন শিক্ষার্থী, রোগী, চালক, ব্যবসায়ীসহ সাধারণ মানুষ। একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ দীর্ঘদিন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়ে থাকা মানে প্রতিদিনই মানুষের সময়, অর্থ ও নিরাপত্তার ওপর চাপ তৈরি হওয়া।
আর পুটিবিলার সেই গর্তে রোপণ করা ধানের চারা যেন এই দীর্ঘস্থায়ী দুর্ভোগেরই প্রতীক। এলাকাবাসী এখন ধান ফলাতে চান না, তারা চান গর্ত ভরাট হোক, পানি সরুক, সড়কটি আবার সড়কের মতো হোক।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ঘোষিত সংস্কারকাজ বাস্তবে কবে শুরু হয় এবং অতিরিক্ত ওজনের যানবাহনের কারণে সড়কের ক্ষয় রোধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে-সেদিকেই এখন তাকিয়ে এলাকাবাসী।
সুপ্রভাত চট্টগ্রাম/আরএসপি/রায়হান
