পলাতক নওফেলের টাকার বলয়ে অধরা ঠিকাদার সাজ্জাদ আলম!

আইনের খাতায় আসামি, বাস্তবে অধিপতি-তাঁকে রুখবে কে?

প্রকাশিত: ২৯ আগস্ট, ২০২৬ ০১:৩০

বিশেষ ফলোআপ প্রতিবেদন : চট্টগ্রাম মহানগরীর কোলাহলপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র রিয়াজউদ্দিন বাজার ও নিউ মার্কেট এলাকা। ২০২৪ সালের ৪ আগস্টের অপরাহ্ণে রাজনৈতিক উত্তাপের মধ্য দিয়ে এক নজিরবিহীন রক্তক্ষয়ী সহিংসতার সাক্ষী হয়েছিল এই অঞ্চল।

প্রকাশ্য অস্ত্রের মহড়া, উপর্যুপরি গুলিবর্ষণ এবং বর্বরোচ্ছেদ হামলায় মুহূর্তের মধ্যে পুরো এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।

সেই ঘটনায় পরবর্তীতে কোতোয়ালি থানায় একটি হত্যাচেষ্টা ও সহিংসতার মামলা দায়ের করা হয় (এফআইআর নম্বর-৩১, জিআর নম্বর-৩৫৫, তারিখ: ৩০ আগস্ট ২০২৪)।

দ্য পেনাল কোড, ১৮৬০-এর ১৪৩, ১৪৭, ১৪৮, ১৪৯, ৩২৩, ৩২৪, ৩০৭, ৩২৫, ৩২৬, ১০৯, ১১৪ ও ৩৪ ধারার মতো অসংযোগযোগ্য ও গুরুদণ্ডনীয় অভিযোগে ২৮৪ জন নামীয় এবং ৪০০ জন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

কিন্তু মামলার সেই সুবিশাল নথিপত্র বিশ্লেষণ করতেই এক বিস্ময়কর ও উদ্বেগজনক নাম স্পষ্ট হয়ে ওঠে-তালিকার ১৭৮ নম্বর আসামি সাজ্জাদ আলম

আদালত ও থানা নথিতে যিনি মারাত্মক সব সহিংসতার অভিযোগে অভিযুক্ত, বাস্তব জগতে তাঁর অবস্থান ঠিক বিপরীত। আইনি নথির চাদর সরিয়ে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, তিনি কেবল এক প্রভাবশালী ঠিকাদার নন, সাবেক শেখ হাসিনা সরকারের শিক্ষামন্ত্রী ও চট্টগ্রাম-৯ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের একচ্ছত্র আর্থিক বলয় ও ঠিকাদারি সাম্রাজ্যের অন্যতম মূল চালিকাশক্তি ছিলেন।

পলাতক মন্ত্রীর ‘অদৃশ্য ক্যাশিয়ার’ ও ঠিকাদারি আধিপত্য:
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ক্ষমতার মূল কেন্দ্রে থাকা ব্যারিস্টার নওফেল এখন আত্মগোপনে বা পলাতক। তবে তাঁর অনুগত ঠিকাদারি সিন্ডিকেট এবং আর্থিক লেনদেনের জাল এখনো সচল রয়েছে বলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সাবেক শিক্ষামন্ত্রীর অদৃশ্য ক্যাশিয়ার হিসেবে নগরের অবকাঠামো উন্নয়ন, সরকারি দপ্তর ও শিক্ষা খাতের কোটি কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প এবং একক দরপত্র নিয়ন্ত্রণে সাজ্জাদ আলমের ভূমিকা ছিল একছত্র।

নওফেলের রাজনৈতিক প্রভাবকে ঢাল বানিয়ে ঠিকাদারি খাতের কমিশন বাণিজ্য থেকে শুরু করে নিজস্ব ক্যাডার বাহিনীর আর্থিক সুরক্ষার উৎস নির্ধারিত হতো এই একক কেন্দ্র থেকেই।

অভিযোগ রয়েছে, ৪ আগস্টের প্রাণঘাতী হামলায় সশরীরে উপস্থিত থাকা, সেই তাণ্ডব সচল রাখতে অস্ত্র ও গোলাবারুদ সংগ্রহ এবং মাঠপর্যায়ের হামলাকারীদের আর্থিক জোগানদাতাদের অন্যতম ছিলেন এই সাজ্জাদ আলম।

সাবেক মন্ত্রীর নির্দেশে ছাত্র-জনতার ওপর সরাসরি গুলিবর্ষণে ব্যবহৃত রসদের নেপথ্য কারিগর হিসেবে তাঁর নামই বার বারবার ঘুরেফিরে আসছে।

ক্ষমতার ছাতায় অপরাধ আড়াল:
মারাত্মক অপরাধের এজাহারভুক্ত ১৭৮ নম্বর আসামি হওয়ার পরও সাজ্জাদ আলম কেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে ‘অধরা’? এই প্রশ্নই এখন চট্টগ্রামের প্রশাসনিক ও সামাজিক মহলে সবচেয়ে বড় অস্বস্তির কারণ।

স্থানীয় সূত্রের দাবি, প্রশাসনিক কিংবা রাজনৈতিক বলয়ের কতিপয় অসাধু সংযোগ বজায় রেখে তিনি এখনো প্রকাশ্যে চলাফেরা করছেন। অপরাধের আইনি দায় থাকা সত্ত্বেও তাঁর ব্যবসায়িক লেনদেন ও প্রভাব বহাল তবিয়তে দৃশ্যমান।

মাঝে সাজ্জাদ আলমের সীমান্ত অতিক্রম বা দেশত্যাগের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়লেও দাপ্তরিক ও সরকারি কোনো খাতায় এর সত্যতা মেলেনি। আর যদি তিনি দেশে থেকে থাকেন, তবে এত গুরুদণ্ডনীয় মামলার আসামি হয়েও পুলিশের উপস্থিতি এড়িয়ে কীভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছেন?

তবে কি সাবেক মন্ত্রীর ফেলে যাওয়া সেই অদৃশ্য শক্তির ছাতা এখনো তাঁকে রক্ষা করে চলেছে?

প্রতিবেদন বন্ধের তদবির ও হুমকির অভিযোগ :
সাজ্জাদ আলমের আর্থিক লেনদেনের তথ্য ও মামলার নথিজাত বিষয়গুলো নিয়ে তাঁর অবস্থান জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি কোনো সরাসরি বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

পরবর্তীতে তাঁর ব্যবহৃত বার্তা আদান-প্রদান মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন পাঠানো হলে তিনি তা এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল নেন।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ওই সংবেদনশীল তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ থামানোর জন্য তিনি বিভিন্ন মাধ্যমে তদবির চালিয়ে যান।

এমনকি সংবাদ বাতিলের জন্য পেশাদার হ্যাকার দিয়ে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাতা এবং ওয়েবসাইট অচল করার মতো প্রচ্ছন্ন হুমকিও প্রদান করা হয়েছে, যা স্বাধীন সাংবাদিকতা এবং আইনি প্রক্রিয়ার ওপর সরাসরি আঘাতের শামিল।

আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগের পরীক্ষা আইনশাস্ত্রের সার্বজনীন নিয়ম হলো-মামলার এজাহারে কারও নাম থাকা মানেই তিনি চূড়ান্ত অপরাধী সাব্যস্ত হন না। অভিযোগ বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত নিরপেক্ষ তদন্তই প্রকৃত সত্য নির্ধারণ করে।

কিন্তু ৪ আগস্টের মতো রক্তক্ষয়ী সহিংসতার ক্ষেত্রে, যেখানে জননিরাপত্তা এবং মানুষের জীবন হানির ঘটনা ঘটেছে, সেখানে ১৭৮ নম্বর আসামির রহস্যজনক আড়ালে থাকা পুরো তদন্ত প্রক্রিয়ার সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

কোনো ব্যক্তি কি কেবল অঢেল অর্থ ও রাজনৈতিক যোগসাজশের কারণে আইনের কাঠামোর বাইরে অবস্থান করতে পারেন? নাকি কোতোয়ালি থানার ৩১ নম্বর মামলার নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করে ক্ষমতার অদৃশ্য দেয়াল ভাঙবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী?

অপরাধের চাদর যত ভারী কিংবা প্রভাব যতই সুদূরপ্রসারী হোক না কেন, আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করাই এখন প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জন্য আসল পরীক্ষা।