সনদ নয়, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষাই প্রকৃত শিক্ষা: জেলা প্রশাসক

প্রকাশিত: ২৮ আগস্ট, ২০২৬ ১৪:৫১

শুধু বই পড়ে জ্ঞান অর্জন কিংবা বড় কোনো ডিগ্রি পেলেই একজন মানুষ প্রকৃত অর্থে মানুষ হয়ে উঠতে পারে না। শিক্ষার সঙ্গে মানবিকতা, দেশপ্রেম ও সামাজিক দায়িত্ববোধের সমন্বয় ঘটানো জরুরি।

বড়দের সম্মান করা, ছোটদের স্নেহ করা এবং বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা তৈরি না হলে সেই শিক্ষা সমাজ কিংবা রাষ্ট্রের প্রকৃত কল্যাণে আসে না। এমন মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।

শুক্রবার সকালে চট্টগ্রাম নগরের জিইসি কনভেনশন সেন্টারে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বইপড়া কর্মসূচির পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

চট্টগ্রাম নগরের কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে কৃতিত্ব অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের পুরস্কৃত করতে দিনব্যাপী এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে জেলা প্রশাসক বলেন, মানুষকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে বই। তাঁর মতে, বই এমন এক বাহন, যা মানুষকে অতীতের কাছে নিয়ে যায়, বর্তমানকে বুঝতে শেখায় এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করতে সহায়তা করে।

তবে শুধু বই পড়লেই শিক্ষার উদ্দেশ্য পূরণ হয় না-শিক্ষাকে জীবনের সঙ্গে, সমাজের সঙ্গে এবং মানুষের সঙ্গে যুক্ত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

জাহিদুল ইসলাম বলেন, শুধু সামনের দুটি চোখ নয়, শিক্ষার মাধ্যমে মনের চোখও খুলতে হবে। যে শিক্ষা অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে, বড়দের সম্মান করতে এবং ছোটদের ভালোবাসতে শেখায়, তিনি শিক্ষার্থীদের সেই শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার আহ্বান জানান।

বর্তমান বিশ্বকে অত্যন্ত প্রতিযোগিতাপূর্ণ উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে তরুণ প্রজন্মকে দক্ষ ও যোগ্য হয়ে উঠতে হবে।

দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ বিপুল জনগোষ্ঠী। এই জনগোষ্ঠীর প্রতিটি মানুষকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করতে পারলেই দেশ আরও এগিয়ে যাবে।

দেশের মেধাবী তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, তাঁদের মেধা ও দক্ষতা দেশের উন্নয়নে কাজে লাগাতে হবে। বাংলাদেশকে বিশ্বদরবারে দৃঢ় অবস্থানে নিয়ে যেতে দেশপ্রেম, মানবিকতা ও আধুনিক জ্ঞানের সমন্বয়ে নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে।

সমাজে ক্রমবর্ধমান আত্মকেন্দ্রিকতা ও স্বার্থপরতার সমালোচনা করে মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম বলেন, মানুষ সামাজিক জীব। সমাজ ও দেশকে ভালো না রেখে কোনো ব্যক্তি একা ভালো থাকতে পারেন না।

অর্জিত শিক্ষা যদি সমাজ ও দেশের কল্যাণে কাজে না লাগে, তাহলে বড় ডিগ্রি কিংবা সনদও একজন মানুষকে স্মরণীয় করে রাখতে পারে না। তাই শিক্ষার মূল লক্ষ্য শুধু ভালো ফলাফল বা উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন নয়; বরং একজন দায়িত্বশীল, মানবিক ও দেশপ্রেমিক মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলা।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পেছনে অসংখ্য মানুষের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে জেলা প্রশাসক বলেন, নতুন প্রজন্মকে সেই আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী একটি নিরাপদ ও মানবিক রাষ্ট্র গড়ে তোলার দায়িত্ব নতুন প্রজন্মকেই নিতে হবে।

তাঁর বক্তব্যে বই পড়ার মাধ্যমে জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি সেই জ্ঞানকে দেশ ও মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানোর বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব পায়।

বই পড়ার পাশাপাশি প্রযুক্তিগত জ্ঞান অর্জনের ওপরও গুরুত্ব দেন জেলা প্রশাসক। তিনি বলেন, প্রযুক্তি একটি কার্যকর সেবক, কিন্তু একই প্রযুক্তি বিপজ্জনক প্রভুও হয়ে উঠতে পারে। প্রযুক্তিকে দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করতে না পারলে তা ব্যক্তি ও সমাজের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে।

তাই শিক্ষার্থীদের বই পড়ার পাশাপাশি প্রযুক্তিগত জ্ঞান অর্জন এবং প্রযুক্তির নিরাপদ ও ইতিবাচক ব্যবহার শেখার আহ্বান জানান তিনি।

চট্টগ্রামে পুরস্কৃত ৫ হাজার ৮৯৬ শিক্ষার্থী

আলোকিত মানুষ গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র গত ৪৮ বছর ধরে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে দেশব্যাপী বইপড়া কর্মসূচি পরিচালনা করে আসছে। বর্তমানে দেশের প্রায় ১ হাজার ৪০০টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দেড় লাখ শিক্ষার্থী এ কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত।

২০২৫ শিক্ষাবর্ষে চট্টগ্রাম নগরের ১০১টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ১৩ হাজার শিক্ষার্থী বইপড়া কর্মসূচিতে অংশ নেয়। মূল্যায়নে কৃতিত্ব অর্জনকারী ৫ হাজার ৮৯৬ শিক্ষার্থীকে দিনব্যাপী উৎসবের দুটি পর্বে পুরস্কৃত করা হয়।

পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মো. বিল্লাল হোসেন খান, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিনিধি, শিক্ষক, অভিভাবক, বিশিষ্টজন এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।

বই, প্রযুক্তি, মেধা ও মানবিকতার সমন্বয়ে নতুন প্রজন্মকে গড়ে তোলার প্রত্যয় নিয়ে আয়োজিত এ অনুষ্ঠান যেন শিক্ষার্থীদের সামনে একটি বার্তাই স্পষ্ট করে দিল—শিক্ষার সার্থকতা শুধু সনদে নয়, মানুষের জন্য কতটা ভালো মানুষ হয়ে ওঠা গেল, তার মধ্যেই প্রকৃত শিক্ষার পরিচয়।