কক্সবাজারের রামু সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, অহেতুক দলিল আটকে রেখে হয়রানি এবং সামান্য ভুলত্রুটিকে পুঁজি করে ঘুষ বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সেবাগ্রহীতাদের দাবি, কার্যালয়টির সাব-রেজিস্ট্রার সাহেদ হোসেন চৌধুরী এবং তার ঘনিষ্ঠ মোহরার নন্দরাম দাশকে কেন্দ্র করে একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তারকারী একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে।
সম্প্রতি স্থানীয় সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে একাধিক ভুক্তভোগী সরাসরি কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে তাদের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরেন। তাদের ভাষ্যমতে, অহেতুক অজুহাতে ফাইল আটকে রেখে অর্থ দাবি করা এখানে নিত্যদিনের চিত্রে পরিণত হয়েছে।
সামান্য বানানের ভুলে ১৫ হাজার টাকা ঘুষ রামু উপজেলার মণ্ডলপাড়া গ্রামের শিক্ষক লোকমানুল হক জানান, সম্প্রতি তিনি এক আত্মীয়ের জমি নিবন্ধনে সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু জমিদাতার খতিয়ানে বাবার নাম ‘নাছির’-এর স্থানে ‘নাদির’ লেখা থাকায় নিবন্ধন প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে বাধ্য হয়ে ১৫ হাজার টাকা দেওয়ার পর দলিলটি নিবন্ধিত হয়। তিনি অভিযোগ করে বলেন, এটি কোনো একক ঘটনা নয়; মোহরার নন্দরাম দাশের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের কাছ থেকে এভাবে অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন
দলিলপ্রতি ‘অফিস খরচ’ ও অনিয়মের হার ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, রামু অফিসে সরকারি ফি-র বাইরে ‘অফিস খরচ’ নামে একটি অলিখিত ঘুষের হার চালু রয়েছে:
-
১০ লাখ টাকার কম মূল্যের দলিল: প্রতি লাখে ১,০০০ টাকা।
-
১০ লাখ টাকার বেশি মূল্যের দলিল: প্রতি লাখে ৭০০ টাকা।
পাশাপাশি জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যে সামান্য অমিল, ‘ওরফে’ বা ‘প্রকাশ’ শব্দের ব্যবহারে অহেতুক আইনি জটিলতা দেখিয়ে টাকা আদায় করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দা খোরশেদ জুয়েল চৌধুরী জানান, কয়েক মাস আগে তার এক আত্মীয়ের জমি রেজিস্ট্রির সময় নামের অমিল দেখিয়ে হয়রানি করা হয় এবং পরবর্তীতে অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধান হয়। এর আগে তার এক চাচাতো ভাইকেও জমি নিবন্ধনে প্রায় এক লাখ টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে।
অন্যদিকে, সাংবাদিক সোয়েব সাঈদ জানান, তার গ্রামের এক অসহায় নারী সন্তানকে অল্প পরিমাণ জমি দানপত্র করতে গেলে চরম হয়রানির শিকার হন, কারণ উক্ত দলিলে অবৈধ অর্থ আদায়ের সুযোগ ছিল না।
কৃত্রিম শর্ত ও হয়রানির বিস্তার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক দলিল লেখক জানান, বর্তমান সাব-রেজিস্ট্রার দায়িত্ব নেওয়ার পর অনিয়ম বহুগুণ বেড়েছে। অন্যান্য অফিসে যেসব বিষয় শিথিল রাখা হয়, এখানে সেগুলো জোরপূর্বক বাধ্য করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, বিগত দুই বছর ধরে খালি ভিটে জমিতে স্থাপনা না থাকা সত্ত্বেও কৃত্রিমভাবে ঘরবাড়ি দেখিয়ে জমির মূল্য বাড়ানো হচ্ছে, ফলে সরকারের রাজস্বের অজুহাতে মূলত বাড়তি রেজিস্ট্রেশন ফি ও ঘুষ দিতে বাধ্য হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
সপ্তাহে তিন দিন অফিস নিয়ম অনুযায়ী কর্মস্থলে উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও সাব-রেজিস্ট্রার সাহেদ হোসেন চৌধুরী সপ্তাহে পাঁচ দিনের পরিবর্তে মাত্র তিন দিন অফিস করেন বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেন। তিনি প্রতিদিন চট্টগ্রাম থেকে এসে দায়িত্ব পালন করেন বলেও জানা গেছে।
১১ মাসে ২১ কোটি টাকার রাজস্ব ও সমান্তরাল বাণিজ্য জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত ১১ মাসে এই কার্যালয়ে ৩,৫৫৮টি দলিলের বিপরীতে প্রায় ২১ কোটি টাকা সরকারি রাজস্ব আদায় হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, সমান্তরালভাবে অতিরিক্ত ও অনিয়ম সূত্রে আদায় করা অর্থের পরিমাণও বিপুল, যা প্রায় সরকারি রাজস্বের কাছাকাছি হতে পারে বলে তাদের ধারণা।
অভিযুক্তদের বক্তব্য ও আইনি তৎপরতা
-
মোহরার নন্দরাম দাশ সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমি কোনোদিন টাকা ধরি না, কাউকে টাকার কথাও বলি না।” তবে সাংবাদিকদের সামনে এক ভুক্তভোগীর প্রশ্নের মুখে তিনি জানান, সেবাগ্রহীতার অনুরোধেই তিনি কাজ করে দিয়েছেন।
-
সাব-রেজিস্ট্রার সাহেদ হোসেন চৌধুরী বলেন, “আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ নির্দিষ্ট নয় এবং সত্য নয়। কে কাকে টাকা দিয়েছে, তা আমার জানা নেই।”
এদিকে রামু উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি মাস্টার মো. আলম জানান, তারা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছেন এবং প্রমানাদিসহ দ্রুত দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ দায়ের করবেন। অন্যদিকে, জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
