চট্টগ্রাম বিআরটিএর বহুল আলোচিত ভালো হয়ে যাও মাসুদ আবারো বদলির আদেশ ঠেকাতে মরিয়া

প্রকাশিত: ০৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২৩:০৩

ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের আত্মীয় এবং ‘ভালো হয়ে যাও মাসুদ’ হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম বিআরটিএর বিভাগীয় পরিচালক মো. মাসুদ আলম দীর্ঘ দিন চট্টগ্রামে অবস্থান করে অবৈধভাবে কোটি কোটি টাকা আয় করে চট্টগ্রাম বিআরটিএকে দুর্নীতির স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এর আগে কয়েকবার তার বদলির আদেশ হলেও তিনি বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয় পরিচয় দিয়ে এবং ওপরমহলকে ম্যানেজ করে সেই আদেশ ধামাচাপা দেন। এমনকি এবারও বদলির আদেশ ঠেকাতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা।

‘তুমি এখনও ভালো হওনি, ভালো হয়ে যাও মাসুদ’—তৎকালীন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের এই বক্তব্যের মাধ্যমে আলোচনায় আসা বিআরটিএ কর্মকর্তা মো. মাসুদ আলমকে অবশেষে চট্টগ্রাম বিভাগীয় অফিস থেকে ঢাকা বিভাগীয় অফিসে বদলি করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) আরও কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার দায়িত্বেও পরিবর্তন আনা হয়েছে।

গত ৩১ আগস্ট বিআরটিএ চেয়ারম্যানের কার্যালয় থেকে জারি করা এক অফিস আদেশে এই বদলি ও পদায়নের কথা জানানো হয়। জনস্বার্থে জারি করা আদেশটি অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে এতে উল্লেখ করা হয়।

অফিস আদেশ অনুযায়ী, বিআরটিএ চট্টগ্রাম বিভাগীয় অফিসের পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মো. মাসুদ আলমকে ঢাকা বিভাগীয় অফিসের পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) হিসেবে বদলি করা হয়েছে। তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন ঢাকা বিভাগীয় অফিসের পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) শফিকুজ্জামান ভূঞা। তাকে চট্টগ্রাম বিভাগীয় অফিসের পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) পদে পদায়ন করা হয়েছে।

এদিকে খুলনা বিভাগীয় অফিসের পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মো. জিয়াউর রহমানকে বিআরটিএ সদর কার্যালয়ের পরিচালক (রোড সেফটি) পদে বদলি করা হয়েছে। পাশাপাশি তাকে বিআরটিএ বরিশাল বিভাগীয় অফিসের পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং)-এর অতিরিক্ত দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে।

একই আদেশে খুলনা বিভাগীয় অফিসের উপপরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) তানভীর আহমেদকে নিজ দায়িত্বের পাশাপাশি ওই বিভাগের পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং)-এর অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মার্চের বদলি আদেশও কার্যকর হয়নি

এর আগে চলতি বছরের ৭ মার্চ বিআরটিএ চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক মো. মাসুদ আলমকে সদর কার্যালয়ের পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) পদে বদলির আদেশ দেওয়া হয়েছিল। একই আদেশে সদর কার্যালয়ের পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহকে পরিচালক (রোড সেফটি) পদে দায়িত্ব দেওয়ার কথা জানানো হয়েছিল।

তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ওই বদলি আদেশ শেষ পর্যন্ত কার্যকর হয়নি। জারি হওয়ার পর রহস্যজনকভাবে সেটি বাতিল হয়ে যায়। কেন আদেশটি বাস্তবায়ন বা বাতিল করা হয়নি, সে বিষয়ে বিআরটিএর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। এ নিয়ে সংস্থাটির কর্মকর্তাদের মধ্যেও নানা ধরনের আলোচনা রয়েছে।

যেভাবে ‘ভাইরাল মাসুদ’

মো. মাসুদ আলম ২০১৭ সালে তৎকালীন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের একটি মন্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ভাইরাল মাসুদ’ নামে পরিচিতি পান। সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ওই সময় বিআরটিএর মিরপুর কার্যালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে মাসুদ আলমকে উদ্দেশ করে ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, ‘ভালো হয়ে যাও মাসুদ।’ পরে মন্ত্রীর সেই বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

ওই সময়ের বক্তব্যে ওবায়দুল কাদের মাসুদ আলম সম্পর্কে আরও বলেছিলেন, ‘মাসুদের সঙ্গে দেখা হলেই প্রায়ই আমি বলি, মাসুদ তুমি ভালো হয়ে যাও। কিন্তু সে এখনও পুরোপুরি ভালো হয়নি।’ তিনি মাসুদের দীর্ঘ দিন বিআরটিএতে থাকার কথা উল্লেখ করে তার ব্যবহারকে ‘মধুরের মতো’ বললেও ‘যা করার একটু ভেতরে ভেতরে করে’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। সেই বক্তব্যের পর থেকেই বিভিন্ন সময় আলোচনায় এসেছে মাসুদ আলমের নাম।

দুই বছরের বেশি সময় চট্টগ্রামে

বিআরটিএর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চট্টগ্রামে যোগ দেওয়ার আগে মো. মাসুদ আলম খুলনা বিভাগীয় অফিসের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে ২০২৪ সালের ২৫ মার্চ তিনি চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) হিসেবে যোগ দেন। এরপর দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি চট্টগ্রাম বিভাগে দায়িত্ব পালন করছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিআরটিএ সদর দপ্তরের একটি পরিচালক পদেও দীর্ঘ দিন ধরে একজন কর্মকর্তাকে একাধিক দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। ফলে সাম্প্রতিক বদলি ও পদায়নের মাধ্যমে দায়িত্ব বণ্টনে কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছে। তবে বদলি ও পদায়নকে ঘিরে সংস্থাটির অভ্যন্তরে ভিন্ন আলোচনাও রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিআরটিএর এক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, বদলি ও পদায়নের আদেশ জারির পর অনেক সময় একটি প্রভাবশালী চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। তাদের প্রভাবের কারণে কোনো কোনো আদেশ বাস্তবায়ন না হয়ে বাতিল বা পরিবর্তিত হয়। ওই কর্মকর্তা দাবি করেন, ‘মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে’ এসব সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের অভিযোগ রয়েছে; তবে তার এই অভিযোগের সপক্ষে কোনো নথি বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

তিনি আরও বলেন, বিআরটিএর অধিকাংশ বদলি ও পদায়নের অফিস আদেশ সংস্থাটির ওয়েবসাইটে নিয়মিত প্রকাশ করা হয় না। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার ঘাটতি তৈরি হয় এবং অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।

‘সরকার বদলায়, সংস্কৃতি বদলায় না’

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বিআরটিএতে বদলি, পদায়ন, পদোন্নতি ও নিয়োগের ক্ষেত্রে নীতিমালা অনুসরণ, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।

তিনি বলেন, ‘বদলি, পদায়ন, পদোন্নতি ও নিয়োগের ক্ষেত্রে নীতিমালা অনুসরণ এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য আমরা একাধিকবার স্মারকলিপি দিয়েছি। কিন্তু এখনও দেখা যাচ্ছে, কিছু প্রভাবশালী কর্মকর্তা একই গ্রেডের মধ্যে বারবার গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পাচ্ছেন।’

মোজাম্মেল হক চৌধুরী আরও বলেন, ‘সরকার বদলায়, কিন্তু বিআরটিএর এই সংস্কৃতি বদলায় না।’

এদিকে সাম্প্রতিক বদলি নিয়ে জানতে চাইলে বিআরটিএর সাবেক চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক এবং বর্তমানে ঢাকা বিভাগীয় অফিসের পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মো. মাসুদ আলম বলেন, ‘এই বিষয়ে আমার কোনো মন্তব্য নেই।’