জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত মালিক বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষ। এই অভ্যুত্থানের দাবিদার আমি, আপনি কিংবা মঞ্চে দাঁড়ানো কোনো ব্যক্তি নন।
চট্টগ্রামে এক আলোচনা সভায় এমন মন্তব্য করেছেন ভূমি প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন।
শুক্রবার (৭ আগস্ট) সকালে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের জুলাই বিপ্লব স্মৃতি হলে ‘ফ্যাসিবাদ, জুলাই বিপ্লব ও আজকের বাংলাদেশ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়নের যৌথ উদ্যোগে এ সভার আয়োজন করা হয়।
মীর হেলাল বলেন, যেদিন বাংলাদেশের মানুষ মনে করেছে-‘আর এ নির্যাতন নয়, আর এ দুঃশাসন নয়, আর এ স্বৈরাচারী সরকারের অধীনে থাকা নয়, আর নয় কোনো পার্শ্ববর্তী দেশের তাবেদারি’-সেদিনই জুলাই অভ্যুত্থানের চূড়ান্ত ফলাফল এসেছে। তাঁর মতে, এই বিষয়টি অনুধাবন করা জরুরি।
তিনি বলেন, জুলাই-আগস্টে যারা শহীদ হয়েছেন, পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন ও আহত হয়েছেন, তাঁদের পাশাপাশি বিগত ১৭ বছরে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং বাংলাদেশিদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে যারা নির্যাতন, হামলা-মামলা, গুম ও খুনের শিকার হয়েছেন, তাঁদের অবদান অস্বীকার করা হলে তা হবে চরম অবিচার। একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশের প্রতিও অবিচার হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
২৪-এর জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা বা বিচ্ছিন্ন বিপ্লব হিসেবে দেখার বিরোধিতা করেন ভূমি প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, এই ধারণাটা শুধু ভুলই নয়, বিভ্রান্তিমূলক।
তাঁর ভাষ্য, জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান ছিল বিগত ১৭ বছরের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভের বিস্ফোরণ।
মীর হেলাল বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে গুম, খুন, হত্যা, নির্যাতন, পাশবিক নির্যাতন, অন্যায় মামলা ও মিথ্যা মামলার মাধ্যমে লাখ লাখ বিএনপি নেতাকর্মী-সমর্থক এবং সরকারবিরোধী বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও পেশার মানুষকে হয়রানি ও নির্যাতন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষ করে সাংবাদিকদের ওপরও অন্যায় ও বর্বরোচিত নির্যাতন হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর মতে, সেই দীর্ঘ সময়ের জমে থাকা ক্ষোভ ও বঞ্চনারই বিস্ফোরণ জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান।
জুলাইয়ের অর্জনকে কোনো নির্দিষ্ট দলের একক অর্জন হিসেবে দেখারও বিরোধিতা করেন তিনি।
মীর হেলাল বলেন, এই মুক্তি কোনো একক দলের নয়, এটি সমষ্টিগতভাবে পুরো বাংলাদেশের জন্য। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্যই এই বিপ্লবের প্রয়োজন ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
কারও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বসানোর জন্য নয়, কাউকে সরকারে বসানোর জন্য নয়, কাউকে এমপি নির্বাচিত করার জন্য নয়, বলেন ভূমি প্রতিমন্ত্রী।
বক্তব্যে প্রতিবেশী দেশ ভারত প্রসঙ্গেও কথা বলেন মীর হেলাল। তিনি বলেন, বাংলাদেশের একজন ‘ফেরারি আসামি’ ও ‘ফাঁসির সাজাপ্রাপ্ত আসামি’ ভারতে বসে দেশ অস্থিতিশীল করার জন্য প্রেস কনফারেন্স করেছেন।
এ ঘটনায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিকভাবে কঠোর ভাষায় প্রতিবাদ জানিয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
মীর হেলাল বলেন, এই বাংলাদেশের জন্যই আমরা যুদ্ধ করেছি। বাংলাদেশের ওপর আর কোনো তাবেদারি চলবে না, আর কোনো খবরদারি চলবে না।
তাঁর ভাষ্য, সামনে বাংলাদেশের নীতি হওয়া উচিত-‘সবার আগে বাংলাদেশ’। আর এই ধারণা ও আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নির্বাচিত সরকারের প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জুলাই অভ্যুত্থানের কৃতিত্ব নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কেরও সমালোচনা করেন ভূমি প্রতিমন্ত্রী। তিনি প্রশ্ন রাখেন, কে এক দফার ঘোষণা দিয়েছে? কে দুই দফার ঘোষণা দিয়েছে? কার কত ক্রেডিট?
মীর হেলালের বক্তব্য, এসব নিয়ে আলোচনা করতে করতেই স্বৈরাচার আবার সাহস দেখানোর সুযোগ পায়।
তিনি বলেন, ডিসেম্বরে ফেরত আসবে, নভেম্বরে ফেরত আসবে-আমরা তো চাই ফেরত আসুক।
তবে দেশে ফিরে তাঁকে বিচারপ্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে বলে মন্তব্য করেন মীর হেলাল। তাঁর দাবি, গত ১৭ বছরসহ জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে যাঁদের হত্যা করা হয়েছে, তাঁদের হত্যার বিচার হতে হবে।
তিনি বলেন, কোনো ক্যাঙ্গারু কোর্ট করব না, কোনো বিশেষ আদালত করব না। বাংলাদেশের প্রচলিত আইনেই বিচার হবে। আর যদি প্রমাণিত হয়, ফাঁসির কাষ্ঠেও চড়তে হবে।
বক্তব্যে তিনি বলেন, আত্মীয়-স্বজন ও পরিবার-পরিজন নিয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর আবার দলের নেতাকর্মী ও জনগণকে ডেকে মাঠে নামানো যাবে-এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।
মীর হেলালের ভাষায়, এই নেতা-কর্মী, জনগণ তো বাদই দিলাম, এই নেতা-কর্মী আবার আপনাদের ডাকে মাথায় মাঠে নামবে-এটা বোকার স্বর্গরাজ্যে বাস করা ছাড়া অন্য কিছু না।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মোহাম্মদ শাহনওয়াজের সভাপতিত্বে সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সভাপতি জাহিদুল করিম কচি।
প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মাওলা মুরাদ ও যুগ্ম সম্পাদক মিয়া মোহাম্মদ আরিফ যৌথভাবে অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন।
সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ, চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মোহাম্মদ আল-ফোরকান, প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. নসরুল কাদির, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন, চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক এম এ আজিজ, চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট তারিক আহমদ, প্রেস ক্লাবের সহসভাপতি মুস্তফা নঈম, মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সালেহ নোমান এবং চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট আব্দুস সাত্তার।
এ সময় চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের ব্যবস্থাপনা কমিটির নেতৃবৃন্দ ও সদস্য, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংবাদকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
