সীতাকুণ্ডে জাহাজভাঙা ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে ৯

প্রকাশিত: ১৪ আগস্ট, ২০২৬ ২১:৫৩

সীতাকুণ্ডের একটি জাহাজভাঙা ইয়ার্ডে কাজ করতে নেমেছিলেন শ্রমিকেরা। হঠাৎ ছড়িয়ে পড়ে বিষাক্ত গ্যাস। মুহূর্তেই অসুস্থ হয়ে পড়েন একের পর এক শ্রমিক। ঘটনাস্থল থেকে দুজনের মরদেহ উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিস।

হাসপাতালে নেওয়ার পরও থামেনি মৃত্যুর মিছিল। শেষ পর্যন্ত এ ঘটনায় নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯ জনে। আহত হয়েছেন আরও বেশ কয়েকজন।

শুক্রবার ভোরে সীতাকুণ্ডের ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে একটি জাহাজে হাউসকিপিংয়ের কাজ করার সময় এ দুর্ঘটনা ঘটে।

ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে জাহাজের ভেতরে প্রবেশ করেন। সেখান থেকে তিন শ্রমিকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

পরে আহতদের উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও ছয়জনের মৃত্যু হয়।

এ ঘটনায় মোহাম্মদ শরীফ নামে আরও এক শ্রমিক নগরীর বেসরকারি ন্যাশনাল হাসপাতালে মারা যান।

নিহতদের মধ্যে রয়েছেন সীতাকুণ্ড উপজেলার আকবর আলীর হাটের মোহাম্মদ সেকান্দারের ছেলে মোহাম্মদ মনসুর, একই এলাকার মোহাম্মদ সেকান্দারের ছেলে মোহাম্মদ নাছির উদ্দীন, উপজেলার খাদেম পাড়ার আব্দুল মালেকের ছেলে হাবিবুর রহমান, উপজেলার ভাটিয়ারির শনি ঠাকুর পাড়ার হবেন্দ্র দাসের ছেলে পলাশ দাস, প্রদীপ দাসের ছেলে সানি দাস, পাবনার ছৈয়দপুর সুজানগর থানার মোহাম্মদ আলীর ছেলে মোহাম্মদ আব্দুল আলীম সুজন, গাইবান্ধার উত্তর কুপতলা সদর থানার মোহাম্মদ হারুন মিয়ার ছেলে মোহাম্মদ রানা মিয়া এবং একই জেলার সুন্দরগঞ্জ থানার মোহাম্মদ রানা মিয়ার ছেলে মোহাম্মদ খোকন মিয়া। এছাড়াও মোহাম্মদ শরীফ নামে আরও এক শ্রমিক মারা গেছেন।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ নুরুল আলম আশেক মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

তিনি বলেন, ভাটিয়ারির দুর্ঘটনায় চট্টগ্রাম মেডিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আটজন এবং একটি বেসরকারি হাসপাতালে একজনের মৃত্যু হয়েছে।

সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. ফখরুল ইসলামও দুর্ঘটনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

দুর্ঘটনার পর ইয়ার্ডজুড়ে তৈরি হয় আতঙ্ক। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধারকাজ শুরু করেন।

ফায়ার সার্ভিসের সীতাকুণ্ড স্টেশনের স্টেশন অফিসার আল মামুন বলেন, আমরা জাহাজভাঙা কারখানায় রয়েছি। এখানে উদ্ধার কাজ চলছে। এখনই বিস্তারিত কিছু বলা যাচ্ছে না।

ফেরদৌস স্টিল শিপইয়ার্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ফেরদৌস ওয়াহিদ জানান, ঘটনাস্থলেই তিনজন মারা যান। আহত হন আরও বেশ কয়েকজন। তাঁদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার পর আরও ছয়জনের মৃত্যু হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, শ্রমিকেরা ইয়ার্ডে কাজ করার সময় হঠাৎ বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে। এতে ১৫ থেকে ২০ জন শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন।

তাঁদের উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে প্রথমে তিনজনকে মৃত ঘোষণা করা হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও তিনজনের মৃত্যু হয়।

দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ এখনো স্পষ্ট নয়। গ্যাস নির্গমন কীভাবে ঘটল, নাকি এর সঙ্গে কোনো বিস্ফোরণের ঘটনা ছিল-তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মাহবুবুল হাসান বলেন, ১০ শ্রমিক অসুস্থ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

তাঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজন মারা গেছেন। বাকিদের সর্বশেষ অবস্থা এখনো জানা যায়নি। গ্যাস নির্গমন নাকি বিস্ফোরণ, সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, ইয়ার্ডে শ্রমিকদের নিরাপত্তাব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না, সেটিও তদন্ত করা হচ্ছে।

অর্থাৎ, দুর্ঘটনার পর এখন শুধু নিহতের সংখ্যা গোনা নয়-কীভাবে একটি কর্মস্থলে বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে এতগুলো প্রাণ কেড়ে নিল, সেই প্রশ্নের উত্তরও খোঁজা হচ্ছে।

ফেরদৌস স্টিল শিপইয়ার্ডে এ ধরনের দুর্ঘটনা এবারই প্রথম নয়। এর আগে গত বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর জিয়া সুবেদার গ্রুপের মালিকানাধীন এই জাহাজভাঙা কারখানায় একই ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় তেলের ট্যাংকার বিস্ফোরণে আট শ্রমিক অগ্নিদগ্ধ হন।

সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শিল্পে দুর্ঘটনার দীর্ঘ তালিকায় সাম্প্রতিক আরেকটি ঘটনা ঘটে ২০২৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর।

সেদিন উপজেলার এসএন করপোরেশন কারখানায় বিস্ফোরণে ১২ শ্রমিক আহত হন। পরে তাঁদের মধ্যে ছয়জন মারা যান।

বারবার এমন দুর্ঘটনার পর এবারও সামনে এসেছে একই প্রশ্ন-ঝুঁকিপূর্ণ এই শিল্পে শ্রমিকদের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত করা হচ্ছে?

শুক্রবারের দুর্ঘটনায় সেই প্রশ্নের উত্তর এখন তদন্তের অপেক্ষায়। তবে এরই মধ্যে নয়টি পরিবারে নেমে এসেছে শোক। যাঁরা ভোরে কাজের জন্য ইয়ার্ডে গিয়েছিলেন, তাঁদের নয়জন আর ঘরে ফিরবেন না।