বৃষ্টি নামতেই চট্টগ্রামজুড়ে জলাবন্দি জীবন, ভোগান্তির চরমে

প্রকাশিত: ১৭ আগস্ট, ২০২৬ ১১:৪৮

রাতভর মুষলধারে বৃষ্টি। সকাল হতেই বদলে গেল চট্টগ্রাম নগরীর চেনা চিত্র। রাজপথ থেকে অলিগলি-বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে গেল পানির নিচে।

কোথাও হাঁটুসমান, কোথাও কোমরসমান পানি। জলাবদ্ধতায় থমকে গেল নগরবাসীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। অফিসগামী মানুষ, পথচারী থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানমুখী শিক্ষার্থীরা পড়লেন চরম দুর্ভোগে।

গত রোববার রাত থেকেই চট্টগ্রামে শুরু হয় মুষলধারে বৃষ্টি। সোমবার সকালে বৃষ্টির তীব্রতা আরও বাড়লে নগরীর রাহাত্তারপুল, বাকলিয়া, চকবাজার, নিউমার্কেট, রিয়াজউদ্দিন বাজার, কাপাসগোলা ও কাতালগঞ্জসহ বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যায়।

গুরুত্বপূর্ণ আখতারুজ্জামান চৌধুরী ফ্লাইওভারেও সৃষ্টি হয় জলজট। ফ্লাইওভারের ওপর থেকে নিচে ঝরনার মতো পানি পড়তে দেখা যায়, যা যান চলাচলে বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করে।

পতেঙ্গা আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য বলছে, ভারী বর্ষণের এই ধারা এখনই থামছে না। পূর্বাভাস কর্মকর্তা মো. ইসমাইল ভূঁইয়া জানান, সোমবার সকাল ৯টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ১৮৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত মাত্র তিন ঘণ্টাতেই বৃষ্টি হয়েছে ৮১ মিলিমিটার।

লঘুচাপের প্রভাব ও মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকার কারণে চট্টগ্রামে আরও দুই থেকে তিন দিন বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন তিনি।

অন্যদিকে, নগরীর আমবাগান আবহাওয়া দপ্তরের কর্মকর্তা ইনচার্জ বিজয় রায় জানিয়েছেন, তাদের সেন্টারে গত ২৪ ঘণ্টায় ১৬৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সেখানেও সকাল ৬টা থেকে পরবর্তী তিন ঘণ্টায় ৮১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

ভারী বর্ষণে সড়কে পানি জমে যাওয়ায় নগরীর প্রধান প্রধান সড়কে যানবাহন চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও ধীরগতিতে যানবাহন চললেও নিচু এলাকাগুলোতে পানি মাড়িয়েই ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন পথচারীরা।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নগরীর চলমান গ্যাস সংকট। গ্যাসের সরবরাহে ঘাটতির কারণে অধিকাংশ সিএনজিচালিত অটোরিকশা সড়কে নামাতে পারেননি চালকেরা। ফলে একদিকে কোমরপানি, অন্যদিকে গণপরিবহনের সংকট-দুইয়ের চাপে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন কর্মজীবী মানুষ ও শিক্ষার্থীরা।

আগ্রাবাদ এলাকার বাসিন্দা সুখী বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রাত থেকে টানা বৃষ্টির পর সকালে রাস্তায় বের হয়ে তিনি হাঁটুসমান পানি দেখতে পান। প্রতি বছর বর্ষা এলেই তাদের একই দুর্ভোগ পোহাতে হয়, কিন্তু এর কোনো স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।

পাথরঘাটা এলাকার বাসিন্দা আবু জাফর জানান, সকালে অফিসের উদ্দেশ্যে বের হয়ে তিনি রাস্তায় থৈ থৈ পানি দেখতে পান। এর ওপর যানবাহনের তীব্র সংকট থাকায় সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

জামালখান এলাকার বেসরকারি চাকরিজীবী মারিয়া আক্তার বলেন, সড়কে পানি জমে থাকায় স্বাভাবিকভাবে হেঁটে চলার পরিবেশও নেই। শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে। বাধ্য হয়ে তাদের পানি মাড়িয়েই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে হচ্ছে।

ভারী বর্ষণের প্রভাব শুধু চট্টগ্রাম মহানগরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। আশপাশের উপজেলাগুলোতেও দেখা দিয়েছে জলাবদ্ধতা।

বোয়ালখালী উপজেলার বিভিন্ন নিচু এলাকায় ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে বোয়ালখালীর চরখিজিরপুর-সাতগড়িয়াপাড়া এলাকায় বর্ষা শুরু হওয়ার পর থেকেই স্থায়ী জলাবদ্ধতায় চরম ভোগান্তিতে রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

সড়কে হাঁটু পানি জমে থাকায় স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী ও সাধারণ পথচারীদের দৈনন্দিন চলাচলে নেমে এসেছে চরম স্থবিরতা।

চট্টগ্রাম নগরবাসীর দীর্ঘদিনের অভিযোগ, সামান্য ভারী বৃষ্টি হলেই নগরীর ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং প্রধান প্রধান সড়কে পানি জমে যায়। এবারও রাতভর বৃষ্টির পর সোমবার সকাল থেকে পরিস্থিতির আশঙ্কাজনক অবনতি ঘটে।

নগরবাসীর দাবি, শুধু বৃষ্টির সময় সাময়িকভাবে পানি সরানোর উদ্যোগ নয়-জলাবদ্ধতার মূল কারণ চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর সমাধান প্রয়োজন।

দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি প্রতি বছর বর্ষা এলেই ফিরে আসা এই দুর্ভোগ থেকে চট্টগ্রামবাসীকে স্থায়ীভাবে মুক্তি দিতে টেকসই পদক্ষেপ নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।