বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন এক তরুণ। হাতে সময় কম, দ্রুত প্রয়োজন পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সনদ। আর সেই তাড়াহুড়োকেই সুযোগ হিসেবে কাজে লাগায় একটি প্রতারক চক্র।
আড়াই লাখ টাকা চুক্তিতে মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে তার হাতে তুলে দেওয়া হয় সরকারি সিল-স্বাক্ষরযুক্ত একটি পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সনদ।
কাগজে সরকারি কর্মকর্তার স্বাক্ষর, সিল-সবই ছিল। এমনকি সনদে থাকা কিউআর কোড স্ক্যান করলেও দেখা যাচ্ছিল সরকারি অনুমোদন। দেখে বোঝার উপায় ছিল না, পুরো সনদটিই জাল।
তবে প্রতারকদের নিখুঁত পরিকল্পনায় শেষ পর্যন্ত ফাটল ধরায় একটি ট্রাভেল এজেন্সির সন্দেহ। তাদের যাচাই প্রক্রিয়ায় বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য-সরকারি সনদের আদলে তৈরি করা হয়েছে নকল কাগজ, আর সেটিকে আসল প্রমাণ করতে বানানো হয়েছে সরকারি পোর্টালের আদলে হুবহু একটি ভুয়া ওয়েবসাইট ও কিউআর কোড।
অভিনব এই জালিয়াতির ঘটনায় চট্টগ্রামে চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে জেলা পুলিশ।
রোববার (১৬ আগস্ট) দিবাগত রাতে চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন এলাকা ও বাঁশখালী উপজেলায় যৌথ অভিযান চালিয়ে জেলা বিশেষ শাখা (ডিএসবি) ও গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তাদের গ্রেপ্তার করে।
গ্রেপ্তার চারজন হলেন-মো. আশরাফ আলী খান (৩৬), মো. নিশান (৩৬), মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন (৪৮) ও মো. আবদুর রহমান (৪৬)।
পুলিশ জানায়, বিদেশগামী ওই তরুণের কাছ থেকে চুক্তি অনুযায়ী আগাম ১ লাখ ২০ হাজার টাকা নেয় চক্রটি। এরপর সরকারি কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর ও সিল জাল করে তৈরি করা হয় ভুয়া পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সনদ।
তবে শুধু জাল সিল-স্বাক্ষরেই থেমে থাকেনি প্রতারকরা। জালিয়াতিকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে তারা সরকারি পোর্টালের আদলে তৈরি করে একটি হুবহু নকল ওয়েবসাইট। পাশাপাশি সনদে যুক্ত করা হয় ভুয়া কিউআর কোড।
সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় ছিল-কিউআর কোডটি স্ক্যান করলেও সরাসরি জালিয়াতি ধরা পড়ার সুযোগ ছিল না। স্ক্যান করলে চলে যেত প্রতারকদের তৈরি করা নকল ওয়েবসাইটে। সেখানে সরকারি তথ্যের আদলে দেখানো হতো ভুয়া অনুমোদন।
অর্থাৎ কাগজে সরকারি সিল-স্বাক্ষর, আর মোবাইলে কিউআর কোড স্ক্যান করলেও অনুমোদন-সব মিলিয়ে সনদটিকে আসল হিসেবে বিশ্বাস করানোর জন্য নেওয়া হয়েছিল প্রযুক্তিনির্ভর অভিনব কৌশল।
চক্রটির তৈরি সনদটি আসল মনে করেই ট্রাভেল এজেন্সিতে জমা দেন ভুক্তভোগী তরুণ। কিন্তু যাচাই করতে গিয়ে সংশ্লিষ্টদের সন্দেহ হয়। এরপর সনদটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলে বেরিয়ে আসে জালিয়াতির বিষয়টি।
ঘটনাটি জানার পর ভুক্তভোগী চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপারকে লিখিতভাবে অভিযোগ দেন।
অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে মাঠে নামে চট্টগ্রাম জেলা গোয়েন্দা শাখা। তদন্তে অর্থ লেনদেনের তথ্যের পাশাপাশি চক্রটির ব্যবহৃত প্রযুক্তির ডিজিটাল তথ্যও বিশ্লেষণ করা হয়।
ডিজিটাল তথ্য ও অর্থ লেনদেনের সূত্র ধরে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই শনাক্ত করা হয় চক্রটির সদস্যদের।
এরপর রোববার দিবাগত রাতে চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন এলাকা ও বাঁশখালী উপজেলায় অভিযান চালিয়ে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এ ঘটনায় বাঁশখালী থানায় একটি মামলা রুজু করা হয়েছে।
চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদ আলম বলেন, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথি, যা বিদেশে একজন বাংলাদেশি নাগরিকের ভাবমূর্তি বহন করে।
সরকারি কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর জাল ও প্রযুক্তির অপব্যবহারের মতো গুরুতর অপরাধে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।
পুলিশ একই সঙ্গে বিদেশগামী নাগরিকদের কোনো মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালের খপ্পরে না পড়ে নির্ধারিত সরকারি ওয়েবসাইট ব্যবহার করে পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের জন্য আবেদন করার আহ্বান জানিয়েছে।
