লোহাগাড়ায় বেইলি সেতুটি এখন মরণফাঁদ! গাড়ি চলাচলে কেঁপে ওঠে পুরো সেতু

প্রকাশিত: ০৭ আগস্ট, ২০২৬ ২২:৪৭

রায়হান সিকদার,লোহাগাড়া : চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার পুটিবিলা ও চুনতি ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী ডলুখালের ওপর নির্মিত বেইলি সেতুটি এখন কার্যত মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে।

বছরের পর বছর সেতুর নিচ থেকে ড্রেজার ও শ্যালো মেশিন দিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন এবং প্রতিদিন শত শত বালু, মাটি ও গাছবোঝাই ভারী যানবাহন চলাচলের কারণে সেতুটির কাঠামো ভয়াবহ ঝুঁকিতে পড়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, মাঝের পিলারের গোড়ার মাটি সরে গিয়ে প্রায় ৩০ ফুট পাইলিংয়ের অন্তত ২০ ফুট উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে। লোহার পাটাতন ঢিলে হয়ে যাওয়ায় একটি অটোরিকশা চলাচল করলেও পুরো সেতু কেঁপে ওঠে।

১৯৯৬ সালে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) অধীনে নির্মিত এই সেতুটি শুধু লোহাগাড়া নয়, পার্বত্য বান্দরবানের লামা ও আলীকদম উপজেলারও গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ মাধ্যম।

প্রতিদিন হাজারো মানুষ এ সেতু ব্যবহার করেন। পাশাপাশি লামা-আলীকদম ও লোহাগাড়ার বিস্তীর্ণ এলাকার ধান, সবজি, ফলমূলসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য বাজারজাতের অন্যতম প্রধান পথ এটি।

সেতুটি ধসে পড়লে কৃষকরা উৎপাদিত পণ্য সময়মতো বাজারে নিতে পারবেন না, পরিবহন ব্যয় বাড়বে এবং কৃষি অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের।

স্থানীয়দের দাবি, যেকোনো সময় সেতুটি ধসে পড়তে পারে। এতে দুই লাখেরও বেশি মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়বেন।

লোহাগাড়ার সঙ্গে লামা ও আলীকদমের সরাসরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে বিকল্প পথে প্রায় ২০ কিলোমিটার ঘুরে চলাচল করতে হবে।

সরেজমিনে আরও দেখা গেছে, সেতুর বিভিন্ন অংশের লোহার পাটাতন ঢিলে হয়ে গেছে। ভারী ট্রাক চলাচলের সময় তীব্র কম্পন সৃষ্টি হয়।

একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে সেতুর নিচ থেকে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের কারণে পিলারের ভিত্তির মাটি সরে গিয়ে পুরো কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, বড় ধরনের দুর্ঘটনা এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা।

২০১০ সালের বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন অনুযায়ী সেতু, কালভার্ট, বাঁধ, সড়ক, মহাসড়ক, বনসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার আশপাশ থেকে বালু উত্তোলন নিষিদ্ধ।

কোনো সেতুর এক কিলোমিটারের মধ্যে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনেরও সুযোগ নেই। কিন্তু আইনের এসব বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে বছরের পর বছর সেতুর গোড়া থেকেই বালু তোলা হচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে শুধু ডলুখালের বেইলি সেতুই নয়, পুটিবিলা বাজার, হাসিনাভিটা সেতু, মসজিদ, আশপাশের বসতভিটা ও বিস্তীর্ণ কৃষিজমিও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। ভাঙনের আশঙ্কায় অনেক কৃষক উদ্বেগে রয়েছেন।

পুটিবিলার বাসিন্দা ও এমচরহাট বাজারের ব্যবসায়ী নুর হোসেন বলেন, রিকশা বা সিএনজি উঠলেই পুরো সেতু কাঁপতে থাকে। নিচে যেভাবে বালু তোলা হয়েছে, তাতে যেকোনো সময় সেতু ভেঙে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

চুনতি পানত্রিশা গ্রামের বাসিন্দা রেজাউল বাহার রাজা বলেন, ভারি চলাচল ও বালুর বড় গাড়ি চলাচলের কারণে বেইলি ব্রিজটির মাঝখানের অংশ দেবে গেছে।

ব্রিজটির দীর্ঘ ৩০বছরের অধিক পুরোনো। ব্রিজের আশপাশে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ হওয়া দরকার। তাই জরুরি ভিত্তিতে ব্রিজটি দ্রুত সময়ের মধ্যে সংস্কারের উদ্যোগ নিলে এলাকার মানুষ উপকৃত হবে।

স্হানীয় ইউপি সদস্য জানে আলম (জানু) বলেন, “অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে সেতুটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বড় দুর্ঘটনার আগেই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

পুটিবিলা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান (ভারপ্রাপ্ত) ইকবাল হোসেন বলেন, পুটিবিলা, ফারাঙ্গা ও পানত্রিশা এলাকায় শতাধিক শ্যালো মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

লোহাগাড়া উপজেলা প্রকৌশলী কাজী ফাহাদ বিন মাহমুদ বলেন, নতুন সেতু নির্মাণের জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। আপাতত ঝুঁকি কমাতে প্রয়োজনীয় সংস্কার কাজ চলছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা(ইউএনও) মো. বায়োজীদ-বিন-আখন্দ বলেন, অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

ইজারা ছাড়া ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলনের কোনো সুযোগ নেই। ইজারা ছাড়া বালু উত্তোলনে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।