পরীক্ষার হলে নয়, লাশ হয়ে ফিরলেন নাফিসা-২৪ ঘণ্টার অভিযানে চালক গ্রেফতার

প্রকাশিত: ২৩ আগস্ট, ২০২৬ ২৩:৩৮

এক বুক স্বপ্ন নিয়ে পরীক্ষার কেন্দ্রের উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বেরিয়েছিলেন নাফিসা নাওয়াল (১৯)। চোখে ছিল ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন, সামনে ছিল ২০২৬ সালের চলমান এইচএসসি পরীক্ষা।

কিন্তু পরীক্ষার হলে পৌঁছানোর আগেই সড়কের নির্মম বাস্তবতা কেড়ে নিল তাঁর প্রাণ। ঘাতক ক্রেনের চাকায় পিষ্ট হয়ে অকালে থেমে গেল দামপাড়া পুলিশ লাইন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির এই মেধাবী ছাত্রীর জীবন।

মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনার পর মাত্র একদিনের মধ্যেই অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত ক্রেনচালককে গ্রেফতার করেছে ইপিজেড থানা পুলিশ।

ঘটনাটি ঘটে শনিবার (২২ আগস্ট) সকাল আনুমানিক পৌণে ৯টার দিকে। নাফিসা তাঁর ভাড়া বাসা থেকে হাজী মোহাম্মদ মহসীন কলেজ কেন্দ্রের উদ্দেশ্যে একটি ‘পাঠাও’ মোটরসাইকেলে (নং-চট্ট মেট্রো-হ-২১-৬৫৬৪) রওনা হন।

ইপিজেড থানাধীন এয়ারপোর্ট টু সল্টগোলা ক্রসিং সড়কের পশ্চিম লেন ধরে যাওয়ার সময় বন্দরটিলা নেভি হাসপাতাল গেটের বিপরীতে পৌঁছালে ঘটে মর্মান্তিক বিপত্তি।

প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বিপরীত দিক থেকে আসা একটি প্যাডেলচালিত ভ্যান গাড়িকে সাইড দিতে গিয়ে হঠাৎ মোটরসাইকেল থেকে রাস্তায় ছিটকে পড়ে যান নাফিসা। তিনি সড়কে পড়ে যাওয়ার মুহূর্তেই একই লেনে পেছন থেকে দ্রুত ও বেপরোয়া গতিতে ধেয়ে আসে ম্যাক্স কোম্পানির একটি ক্রেন।

ক্রেনটির রেজিস্ট্রেশন নম্বর ACM ৯৪৯। কিছু বুঝে ওঠার আগেই রাস্তায় পড়ে থাকা নাফিসাকে নির্মমভাবে চাপা দেয় ক্রেনটি। এতে তিনি গুরুতর আহত ও রক্তাক্ত হন।

দুর্ঘটনার ভয়াবহতা দেখে স্থানীয় পথচারীরা দ্রুত এগিয়ে আসেন। ঘটনাস্থলে থাকা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ইন্টার্ন ডাক্তার মারিয়াসহ উপস্থিত লোকজন নাফিসাকে উদ্ধার করে দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি।

হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে নাফিসাকে মৃত ঘোষণা করেন। যে তরুণী কিছুক্ষণ আগেও স্বপ্ন নিয়ে পরীক্ষার কেন্দ্রে যাওয়ার পথে ছিলেন, মুহূর্তেই তাঁর সেই স্বপ্নযাত্রা পরিণত হয় শেষযাত্রায়।

নাফিসার মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই পুরো এলাকা ও তাঁর সহপাঠীদের মাঝে নেমে আসে শোকের ছায়া। পরিবার, স্বজন ও সহপাঠীদের কাছে মুহূর্তেই অপূরণীয় হয়ে ওঠে ১৯ বছরের এই প্রাণবন্ত তরুণীর চলে যাওয়া।

এদিকে দুর্ঘটনার ঘটনায় নিহত নাফিসার পিতা মামুন (৪৬) বাদী হয়ে ইপিজেড থানায় একটি এজাহার দায়ের করেন। এজাহারের ভিত্তিতে সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮-এর ৯৮/১০৫ ধারায় মামলা নং-১০ রুজু করা হয়।

মামলা দায়েরের পর অভিযুক্তকে গ্রেফতারে মাঠে নামে ইপিজেড থানা পুলিশ। ইপিজেড থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মুহাম্মদ আতিকুর রহমানের নেতৃত্বে এবং মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই (নিঃ) হেফাজ উদ্দিনের সমন্বয়ে শুরু হয় অভিযান।

অবশেষে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ঘটনার পরদিন রবিবার (২৩ আগস্ট) রাত সাড়ে ৮টার দিকে ইপিজেড থানাধীন ফ্রি পোর্ট এলাকায় ঝটিকা অভিযান চালায় পুলিশ। অভিযানে ঘাতক ক্রেনচালক শামীম বিশ্বাস (৩১)-কে গ্রেফতার করা হয়।

পুলিশ জানায়, গ্রেফতার শামীম বিশ্বাস মাগুরা জেলার শ্রীপুর বরিশাট ৯ নং ওয়ার্ডস্থ বেপারী পাড়ার বাসিন্দা মো. টিপু সুলতান ও ছালেহা বেগমের ছেলে।

তিনি চট্টগ্রামের ম্যাক্স কোম্পানির ক্রেনচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। চাকরির সুবাদে নগরীর কোতোয়ালী থানাধীন ওয়াসা জামায়াতুল ফালাহ মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

ইপিজেড থানার ওসি মুহাম্মদ আতিকুর রহমান (বিপিএম) বলেন, ঘটনার পরপরই টিম ইপিজেডের তাৎক্ষণিক ভূমিকায় অভিযুক্তকে আইনের আওতায় আনতে সক্ষম হয়েছি।

তিনি জানান, গ্রেফতার আসামি শামীম বিশ্বাসকে বিধি মোতাবেক আদালতে সোপর্দ করার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।